বৃহস্পতিবার,৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সবুজের মাচায় মাটির লাল সোনা, অসময়ের তরমুজ চাষে ভাগ্য বদলাচ্ছে পাকুন্দিয়ার কৃষক

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাকুন্দিয়া উপজেলার দিগন্ত বিস্তৃত মাঠজুড়ে এখন আর শুধু প্রথাগত ধানের সবুজ চোখে পড়ে না। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিন কিংবা শরৎ-হেমন্তের অসময়েও এই উপজেলার গ্রামগুলোর ক্ষেতে নজর কাড়ছে সারিবদ্ধ শক্তপোক্ত মাচা। আর সেই মাচার নিচে ঝুলছে ডাবল নেটে বাঁধার মাধ্যমে সুরক্ষিত টকটকে ও সুস্বাদু হাজার হাজার তরমুজ।
​একসময় যে সময়ে তরমুজের নাম শুনলেও মানুষ অবাক হতো, সেই অবোধ্য অসময়েই এখন পাকুন্দিয়ার মাঠে মাঠে চলছে ফলনের উৎসব। প্রথাগত ফসল চাষ করে বারবার লোকসানের মুখে পড়া প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে এ আর মালিক সিডস-এর উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের বীজ ও আধুনিক মালচিং প্রযুক্তি। ১ বিঘা জমি থেকে কয়েক লাখ টাকা মুনাফা গুনে পাকুন্দিয়ার কৃষকরা এখন শুধু স্বাবলম্বীই হননি, বরং পুরো অঞ্চলের কৃষিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
​সাধারণত চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড দাবদাহে তরমুজের কদর বাড়ে। তবে বছরের অন্য সময়গুলোতে বাজারে রসালো এ ফলের জোগান থাকে না বললেই চলে। পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা, এগারসিন্দুর, আঙ্গিয়াদী ও ষাইটকাহনসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা এই সুযোগটিকেই কাজের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। ​কয়েক বছর আগেও বর্ষা ও পরবর্তী সময়ে যে সকল জমি জলাবদ্ধতা বা অনাবাদি অবস্থায় ফেলে রাখা হতো, আজ সেখানে ঝুলছে লাখ লাখ টাকার ফসল। কৃষকরা জানান, প্রচলিত ফসল আবাদ করে সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচ তুলতেই তাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এ আর মালিক সিডস-এর অফ-সিজন হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করে তারা অত্যন্ত স্বল্প সময়ে ও কম খরচে নজিরবিহীন সাফল্য পাচ্ছেন।
​অসময়ে তরমুজ চাষ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা কিংবা আর্দ্রতার কারণে গাছ পচে যাওয়া ও ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বহুগুণ। কৃষকদের এই দূর্যোগ থেকে রক্ষা করেছে ‘এ আর মালিক সিডস প্রাঃ লিঃ’-এর উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন বীজ। অসময়ের অনুকূল ও প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম মালিক সিডস-এর বিখ্যাত জাতগুলো সম্পর্কে স্থানীয় কৃষকদের মূল্যায়ন এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ​পাকিজা (Pakeeza) হলো এ আর মালিক সিডস-এর অন্যতম জনপ্রিয় হাইব্রিড ড্রাগন/ডোরাকাটা জাত। এটি ভাইরাস সহনশীল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি বা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। রোপণের মাত্র ৬০-৭০ দিনের মাথায় এটি পরিপক্ব হয়। প্রতিটির গড় ওজন ৮ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং ভেতরে টকটকে লাল মাংসল অংশে মিষ্টতার পরিমাণ (TSS) প্রায় ১৪% পর্যন্ত পৌঁছায়। ​আস্থা (Aastha) হলো প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম আরেকটি উচ্চফলনশীল জাত। ফলন দ্রুত আসে এবং রোগবালাই আক্রমণ কম করে। ​সুইট ব্ল্যাক / ব্ল্যাক বেবি হলো কুচকুচে কালো ত্বকের সুস্বাদু ও অত্যন্ত সুমিষ্ট জাত, যা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, বাজারে এর চাহিদাও ব্যাপক। কৃষকরা বলেন, “অন্যান্য বীজে যেখানে গজানোর হার কম থাকে এবং ভাইরাসের কারণে পুরো খেত নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে, সেখানে মালিক সিডস-এর বীজে গজানোর হার শতভাগ নিশ্চিত। গাছগুলো বেশ সবল হয় এবং অসময়ের দুর্যোগেও টিকে থাকে।”
​অসময়ে তরমুজ চাষের এই সাফল্যের পেছনে শুধু বীজই নয়, রয়েছে আধুনিক কৃষিতথ্য ও পদ্ধতির সফল প্রয়োগ। সরেজমিনে মাঠে গিয়ে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। মাটিতে বিশেষ ধরনের সিলভার ও কালো রঙের মালচিং পেপার বিছিয়ে চারা রোপণ করা হয়েছে । এর ফলে জমিতে আগাছা জন্মাতে পারে না, মাটির ময়েশ্চার বা আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং ক্ষতিকর পোকা-মাকড় দূরে থাকে। তরমুজ গাছগুলোকে মাচা তৈরি করে ওপরে তুলে দেওয়া হয়েছে । ফল যখন বড় হতে শুরু করে, তখন ফলের ভারে যেন লতা ছিঁড়ে না যায়, সে জন্য প্রতিটি তরমুজকে ফলনের জালি বা সুতা দিয়ে মাচার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।তাছাড়া রাসায়নিক কীটনাশক পরিহার করে ফেরোমেন ট্র্যাপ ও ইয়েলো ট্র্যাপ ব্যবহার করায় তরমুজগুলো সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত রয়েছে।
​পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক ও জসিম উদ্দিনের মতো বহু চাষির জীবনে এই তরমুজ নিয়ে এসেছে স্বাবলম্বিতার নতুন আলো। ৪০ শতক অর্থাৎ প্রায় এক বিঘা জমিতে এ আর মালিক সিডস-এর বীজ ব্যবহার করে প্রথমবারই নজিরবিহীন সফলতা লাভ করেছেন আবু বকর। শুরুতে অসময়ে চাষাবাদ নিয়ে মনের মধ্যে তীব্র শঙ্কা থাকলেও আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক বীজের চয়ন তাঁর সেই ভয় দূর করে দিয়েছে।
​মাঠ পর্যায়ে এই চাষাবাদের খরচ ও আয়ের বিস্তারিত হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে উচ্চ গুণগত মানের এ আর মালিক সিডস-এর বীজ ক্রয়, জমি তৈরি এবং আধুনিক মালচিং পেপার বিছানোর পেছনে প্রাথমিক ব্যয় হয় আনুমানিক ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা। এরপর গাছের সুরক্ষায় বাঁশের মাচা তৈরি, সুতা ও বিশেষ জালি বা নেট কেনা এবং খেতের মজুরি বাবদ খরচ হয় প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা। পরবর্তীতে সুষম জৈব সার প্রয়োগ, খেতের নিয়মিত পরিচর্যা ও সেচ ব্যবস্থার পেছনে কৃষকের ব্যয় হয় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকার মতো। ​সব মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে বীজ রোপন থেকে শুরু করে ফসল পাকা পর্যন্ত মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫,০০০ থেকে ৫৫,০০০ টাকার মধ্যে। এর বিপরীতে, অফ-সিজনে বাজারে তীব্র চাহিদা থাকায় এবং ফলের ওজন ও মিষ্টতা চমৎকার হওয়ায় একই জমি থেকে উৎপাদিত তরমুজ বাজারে বিক্রয় করে আয় হয় প্রায় ১,৮০,০০০ থেকে ২,২০,০০০ টাকা। অর্থাৎ সমস্ত আনুষঙ্গিক ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় কৃষকের নিট বা প্রকৃত লাভ থাকে ১,২৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৬৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। ​কৃষক আবু বকর সিদ্দিক আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম অসময়ে তরমুজ হবে কি না। কিন্তু মালিক সিডস-এর ভালো বীজ আর কৃষি অফিসারদের পরামর্শে মাঠে নেমে আজ আমি সফল। ৪০ শতক জমিতে ৫০ হাজার টাকার মতো খরচের বিপরীতে ইতোমধ্যে জমি থেকেই হাজার হাজার টাকার ফসল বিক্রি করেছি। পুরো খেত বিক্রি শেষ হলে দেড় লাখ টাকারও বেশি নিট লাভ থাকবে। জীবনে প্রথাগত কোনো ফসল ফলিয়ে এত দ্রুত এত বেশি মুনাফা দেখিনি।”
​মৌসুমের বাইরের তরমুজ হওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে এর চাহিদা আকাশচুম্বী। সাধারণ মৌসুমে যেখানে তরমুজ কেজি প্রতি ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে অফ-সিজনে সুস্বাদু এই তরমুজ খেত থেকেই কেজি প্রতি ৭০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ​পাইকারি ফল ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের খেতেই চলে আসছেন গাড়ি নিয়ে। ঢাকার কাওরান বাজার ও স্থানীয় কিশোরগঞ্জ সদর থেকে আসা এক ব্যবসায়ী বলেন, “অসময়ে তরমুজের চাহিদা ব্যাপক। বিশেষ করে মালিক সিডস-এর পাকিজা বা সুইট ব্ল্যাক জাতের তরমুজ কাটার পর ভেতরটা টকটকে লাল বের হয় এবং প্রচণ্ড মিষ্টি হয়। ক্রেতারা একবার নিলে বারবার খোঁজেন।”
​পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি মৌসুমে পাকুন্দিয়া উপজেলায় বেশ ভালো পরিমাণ জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ হয়েছে। অন্যান্য প্রথাগত ফসলের তুলনায় বহুগুণ বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত হাইব্রিড জাতের অসময়ের তরমুজের দিকে ঝুঁকছেন। ​উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তা আরো বলেন, ​”উন্নত জাতের বীজ নির্বাচনই আধুনিক কৃষির সাফল্যের ৫০% নিশ্চিত করে। এ আর মালিক সিডস-এর মতো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের জাতগুলো এবং সঠিক মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের কৃষকরা অভাবনীয় লাভ করছেন। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা মাঠ পর্যায়ে মাচা তৈরি, সার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাইনাশক বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।”
​একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতা যেখানে কৃষকদের হতাশায় ফেলত, সেখানে এ আর মালিক সিডস-এর উন্নত বীজ ও পাকুন্দিয়ার কৃষকদের পরিশ্রম এক নতুন স্বপ্নের দুয়ার উন্মোচন করেছে। দিগন্ত জুড়ে সবুজ মাচার নিচে ঝুলতে থাকা রসালো লাল তরমুজগুলো কেবল একটি সফল ফসলই নয়—তা পাকুন্দিয়ার শত শত প্রান্তিক চাষির নতুন জীবনের প্রতীক। ​সঠিক সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং মানসম্মত বীজের সহজলভ্যতা বজায় থাকলে এই পাকুন্দিয়াই একদিন পুরো দেশের অফ-সিজন তরমুজের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন