
‘আমি তো মারামারির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মতো হাঁটাচলা করছিলাম। তারপরও আমাকে কেন এভাবে মারল? আমার দোষ কী ছিল?’- হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এমন প্রশ্নই করছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব হোসাইন।
তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো পক্ষের সঙ্গে জড়িত না থেকেও রড, স্ট্যাম্প ও হাতুড়ি দিয়ে তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করে বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে নজরুল প্রিমিয়ার লিগ (এনপিএল) টুর্নামেন্ট চলাকালে বলের সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। এর একপর্যায়ে সাকিবের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে তার অভিযোগ। বর্তমানে তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে সাকিব বলেন, বিদ্রোহী হল থেকে খাবার খেয়ে বাইরে হাঁটতে বের হয়েছিলেন তিনি। হল থেকে বের হয়ে বন্ধু অর্কর সঙ্গে দেখা হয়। কিছুক্ষণ কথা বলার পর অগ্নিবীণার দিকে হাঁটতে থাকেন। তবে সেখানে পৌঁছানোর আগেই হাতাহাতি শেষ হয়ে যায়। কী নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছিল, তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।
পরে বিবিএ ফ্যাকাল্টির সামনে নিজের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখতে পান তিনি। সেখানে রিদন ও তাসিনকে ডেকে মারামারিতে জড়াতে নিষেধ করেন। এরপর সেন্ট্রাল ফিল্ড পেরিয়ে সিঙ্গারা হাউসের সামনের ড্রেনের কাছে যান। সেখানে বন্ধু আরবের সঙ্গে দেখা হলে সে সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চান।
কিছুক্ষণ পর ম্যানেজমেন্ট, বিবিএ ফ্যাকাল্টি ও অন্যান্য বিভাগের আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ জন শিক্ষার্থীকে মাঠে জড়ো হতে দেখেন বলে জানান সাকিব। তার অভিযোগ, তাদের অনেকের হাতেই রড, পাইপ, স্ট্যাম্প ও হাতুড়ি ছিল।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে- এমন আশঙ্কায় সাকিব কলাভবনের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে নিজের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সতর্ক করে বলেন, ‘ওরা রড, স্ট্যাম্প, হাতুড়ি নিয়ে এসেছে। আপনারা এখান থেকে চলে যান, নয়তো বড় কোনো ঝামেলা হয়ে যাবে।’
এরপর সেখান থেকে চলে যান তিনি। পরে ফার্স্ট গেটের দিকে যাওয়ার পথে নতুন সায়েন্স ফ্যাকাল্টির কাছের মোড়ে প্রক্টরের সামনেই ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থীদের হামলা করতে দেখেন বলে দাবি করেন সাকিব। পরিস্থিতি এড়াতে নির্মাণাধীন সায়েন্স ফ্যাকাল্টির পাশের ফুটপাত দিয়ে আরও পেছনে সরে যান তিনি।
সাকিবের ভাষ্য, কিছুক্ষণ পর শুভ ও রবিউল নামে দুই শিক্ষার্থী পরিচিতদের খোঁজ নিতে তার মুঠোফোন ব্যবহার করতে চান। ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছিল। পরে তিনি ১৮ ব্যাচের রাহাদকে ফোন করেন। রাহাদ ও তাসিন সেখানে এলে তাসিনকে রিদনের খোঁজ নিতে বলেন। পরে ফোনে জানতে পারেন, রিদন কক্ষে ফিরে গেছেন। তাকে পায়ে রড দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং হলের সামনে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও জানতে পারেন সাকিব।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাকিব বলেন, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল রড, স্ট্যাম্প ও হাতুড়ি নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসেন। তার সঙ্গে থাকা চারজন দৌড়ে পালিয়ে যান। তাকে কেউ আক্রমণ করবেন না- এমন ধারণা থেকে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ‘এটাও ইংলিশের, এটারে ধর’ বলে চিৎকার শুনে তিনিও দৌড় দেন।
তার অভিযোগ, এরপর কলাভবনের পেছনে ড্রেনের ওপর ফেলে তাকে মারধর করা হয়। পরিচিত মুখের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হামলায় অংশ নিতে দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন তিনি। এ সময় তার ডান হাতে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিল। ড্রেনের ওপর পড়ে যাওয়ায় মুঠোফোনটি ভেঙে যায়।
সাকিবের দাবি, একপর্যায়ে তার কপালে রড বা স্ট্যাম্প দিয়ে পরপর ৩টি জোরে আঘাত করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। এরপরও তাকে রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হয়। পিঠ থেকে পা পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। রক্তে ভিজে যায় শরীর। নাক বন্ধ হয়ে আসে এবং মুখে রক্ত চলে যায়। একপর্যায়ে তার জ্ঞান ফিরে আসে।
সাকিব জানান, যখন মারপিট করা হচ্ছিল তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলজিইডি বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী সজিব তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন। সজিব হামলাকারীদের উদ্দেশে বলছিলেন, ‘এ তো কোথাও ছিল না, এরে কেন তোরা মারতেছিস?’ এরপরও হামলা থামেনি বলে অভিযোগ সাকিবের। তার দাবি, এ সময় পাশ থেকে তাকে লাথিও মারা হয়।
আহত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হামলার নেতৃত্বে থাকা রায়হান তালুকদারের কাছে নিজের অপরাধ জানতে চেয়েছিলেন বলে জানান সাকিব। তার ভাষ্য, তখন রায়হান বলেন, ‘তোর হাতে রড ছিল কেন?’ জবাবে সাকিব বলেন, ‘তারা যদি কোথাও প্রমাণ দেখাতে পারে, আমার হাতে রড বা অন্য কিছু ছিল, তাহলে আমি নিজেই এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাব।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাকিব বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, মারামারি করতে আসিনি। অন্যায়ভাবে আমাকে মারধর করা হয়েছে। আমি নির্দোষ। আমি বাঁচতে চাই, আমাকে বাঁচান। যারা অন্যায়ভাবে আমাকে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিয়ান আলম তাসিন বলেন, সাকিব ও রবিউলকে যখন মারধর করা হচ্ছিল, তখন তিনি ও তার সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তারা নতুন কলা ভবনের সামনের দিকে অবস্থান করছিলেন। এ সময় প্রায় ২০ থেকে ৩০ জনকে ভবনের পেছনের দিকে যেতে দেখেন, যারা সাকিব ও রবিউলকে মারধর করতে যাচ্ছিলেন বলে তার ধারণা।
তাসিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। একইসঙ্গে এটি আমাদের সবার জন্য সচেতন হওয়ার একটি বড় বার্তা। আমরা রাজনীতি নেই বললেও বর্তমানে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতি রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করেও এতটা হিংস্র মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। অথচ একটি ফুটবল খেলার মাঠের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন নৃশংস মারধরের ঘটনা ঘটল, যা সত্যিই উদ্বেগজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক হতে হবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায়, এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এতে এমন নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হবে যে এত হিংস্রভাবে মারধর করার পরও কোনো বিচার হয় না। ফলে যে কেউ মারামারি করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির অবসান হোক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’
সাকিবকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনার নেতৃত্বে থাকার অভিযোগ ওঠা রায়হান তালুকদার বলেন, ‘আমি সাকিবকে মারিনি। এই ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই।’
রায়হান তালুকদার ও সিফাতের নেতৃত্বে থাকা অন্যরা হলেন- দিদারুল, নসিম, রায়হান, মাসুদ রানা মুবিন, জিলানী, হেসাইন, আরিফ, মশিউর রহমান সাহান, রিয়াদসহ আরও অনেকেই হামলার সঙ্গে জড়িতে ছিলেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) টুর্নামেন্ট চলাকালে বলের সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ছয় শিক্ষার্থী আহত হন। তাদের কয়েকজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু তদন্ত, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।




