ঈদ এলেই ঢাকার চিরচেনা ব্যস্ততা কমে যায়। পরিবারের সঙ্গে ঈদের খুশি উদযাপন করতে আর আনন্দে সময় কাটাতে লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের পথে রওনা দেয়। ফলে কয়েক দিনের জন্য রাজধানীর অনেক এলাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই সময়টাতে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। তবে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ। এবারের ঈদে যেন কোনো ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সেজন্য প্রযুক্তিনির্ভর ও আগ্রাসী পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঈদের টানা ৭ দিনের ছুটিতে (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) রাজধানী ছাড়ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এই সময়ে ফাঁকা বাসাবাড়ি ও কম জনসমাগমকে কেন্দ্র করে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সংস্থাটির কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, প্রচলিত পুলিশিংয়ের বাইরে গিয়ে এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
পুলিশ জানায়, এক মাস ধরে রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের ওপর বিশ্লেষণ চালিয়ে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এই অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি নগরজুড়ে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায়ে টহল কার্যক্রমে আনা হয়েছে নতুনত্ব। অনেক সময় টহল টিমের কার্যক্রমে শিথিলতা দেখা যাওয়ায় এবার প্রতিটি টহল গাড়িতে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন গাড়ি কোথায় যাচ্ছে, কতক্ষণ টহল দিচ্ছে—সবকিছুই কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা হচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনাররা সারা রাত তদারকি করছেন, পাশাপাশি অন্য কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন।
শুধু টহল নয়, প্যাট্রল টিমগুলোকে চেকপোস্টের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করছেন এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিং ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের ফাঁকফোকর না থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, গত এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘এগ্রেসিভ পুলিশিং’ চালু রাখা হয়েছে, যা ঈদের ছুটিতেও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে শুধু রাজধানী নয়, ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে মহাসড়কেও বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যানজটপ্রবণ ২০৭টি স্থান চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনগুলোতে পুলিশ ও র্যাবের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। কোনো অনিয়মের সঙ্গে আপস না করার কঠোর বার্তাও দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।
নিরাপত্তার পাশাপাশি জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। বাসা ফাঁকা রেখে যাওয়ার আগে মূল্যবান জিনিস নিরাপদ স্থানে রাখা, প্রয়োজন হলে পুলিশকে অবহিত করা, যাত্রাপথে অজ্ঞান পার্টি থেকে সতর্ক থাকা এবং অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এলাকায় সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা কার্যক্রম দেখা গেলে দ্রুত ৯৯৯-এ জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সড়ক ও নৌপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মহাসড়কে গতিসীমা মেনে চলা এবং নৌযানে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, এবার ঈদে কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকি নেই। তবে সম্ভাব্য সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের সমন্বিত তৎপরতায় ফাঁকা ঢাকাকেও নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।




