চিঠির যুগ পেরিয়ে সেবার নতুন ব্যস্ততা, কুবি ডাকঘরে আট মাসে ইস্যু ৫২৯৮ ডাক

একসময় দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। প্রিয়জনের খবর থেকে শুরু করে দাপ্তরিক যোগাযোগ—সবকিছুর জন্যই নির্ভরতা ছিল ডাকঘরের ওপর। তবে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে। একই সঙ্গে বদলে গেছে ডাকসেবার ধরন। এখন চিঠির পাশাপাশি দাপ্তরিক নথি, পার্সেল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দ্রুত ডাকসেবা ঘিরেই ব্যস্ততা বাড়ছে ডাকঘরে।
জাতীয় পর্যায়ে ডাক বিভাগও সময়ের সঙ্গে সেবার পরিধি বাড়িয়েছে। প্রচলিত চিঠি আদান-প্রদানের পাশাপাশি পার্সেল, ইএমএস, স্পিড পোস্ট, অনলাইন ট্র্যাকিং, ই-কমার্স ডেলিভারিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা যুক্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ডাকঘরেও। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে কুবি ডাকঘর থেকে মোট ৫ হাজার ২৯৮টি ডাক ইস্যু এবং ৪ হাজার ৩৫৯টি ডাক বিলি হয়েছে। এ সময়ে বুকিং চার্জ হিসেবে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ২৮৬ টাকা।
কুবি ডাকঘরের আট মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৭৮৭টি ডাক ইস্যু এবং ৫৭৭টি বিলি করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ইস্যু ৫৬৬টি ও বিলি ৫৭৫টি, মার্চে ইস্যু ৪২০টি ও বিলি ৪১৩টি। এপ্রিলে ৫৭২টি ডাক ইস্যু ও ৫৫৪টি বিলি করা হয়। মে মাসে ইস্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯৯টিতে, তবে ওই মাসে বিলি হয় ৩৯৯টি।
জুনে ডাক ইস্যুর সংখ্যা কমে ৩২১টিতে নামলেও বিলি হয় ৫৩১টি। জুলাইয়ে ৬২৪টি ডাক ইস্যু এবং ৫৭৩টি বিলি করা হয়। আর আগস্টে এসে ইস্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ওই মাসে ১ হাজার ২০৯টি ডাক ইস্যু এবং ৭৩৭টি ডাক বিলি করা হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসের মধ্যে আগস্টেই ইস্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ।
চিঠি, পার্সেল ও ডকুমেন্ট—এই তিন ধরনের সেবার পরিসংখ্যানেও ডাকঘরের পরিবর্তিত কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া যায়। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুবি ডাকঘর থেকে মোট ৩ হাজার ৪৮৭টি চিঠি ইস্যু এবং ২ হাজার ৪৪০টি চিঠি বিলি হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ২১৬টি পার্সেল ইস্যু এবং ১ হাজার ৮০২টি পার্সেল বিলি করা হয়েছে। এছাড়া আট মাসে ৫৫৮টি ডকুমেন্ট ইস্যু এবং ১০১টি ডকুমেন্ট বিলি হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন মাসে জিইপি ও স্পিড পোস্টের মতো সেবাও ব্যবহার হয়েছে।
চিঠি ইস্যুর ক্ষেত্রে আগস্টে ছিল উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জানুয়ারিতে যেখানে ৫৫৯টি চিঠি ইস্যু হয়েছিল, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭২টিতে। অর্থাৎ জানুয়ারির তুলনায় আগস্টে ৪১৩টি বেশি চিঠি ইস্যু হয়েছে। অন্যদিকে জানুয়ারিতে ১৮৭টি পার্সেল ইস্যু হলেও আগস্টে ইস্যু হয়েছে ১৭৯টি। তবে পার্সেল বিলির ক্ষেত্রে আগস্টে ২৯৮টি বিলি হয়েছে, যেখানে জানুয়ারিতে ছিল ২১১টি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসের ডাকঘরে থাকা এসব সেবা ও এর তুলনামূলক কম খরচ সম্পর্কে জানেন না। অথচ সরকারি ডাকসেবার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিঠি, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও পার্সেল পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। ডাক বিভাগের নির্ধারিত মাশুল অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সাধারণ চিঠি পাঠাতে খরচ ৫ টাকা। একই শহরের মধ্যে সিটি পোস্টে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত ৫ টাকা এবং ১০১ থেকে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত ৭ টাকা দিতে হয়। আর ১ কেজি পর্যন্ত ডকুমেন্ট পাঠাতে ডাক মাশুল ২৫ টাকা; এরপর প্রতি অতিরিক্ত ১০০ গ্রাম বা তার অংশের জন্য ১ টাকা করে যোগ হয়।
জরুরি ভিত্তিতে স্পিড পোস্টের ক্ষেত্রেও প্রথম ১ কেজি পর্যন্ত মাশুল ১০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কেজি বা তার অংশের জন্য ৫ টাকা। এর সঙ্গে সেবাভেদে ৩ টাকা রেজিস্ট্রেশন বা ৫ টাকা জিইপি চার্জ এবং ১ টাকা ইলেকট্রনিক চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ছাড়া ডাক বিভাগের পার্সেল সেবায় পাঠানো সামগ্রীর ট্র্যাকিং সুবিধা রয়েছে এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও রয়েছে। ডাক বিভাগের অনলাইন ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ মেইল ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা থাকায় পাঠানো আইটেমের অবস্থানও অনুসরণ করা যায়। ফলে কুরিয়ারনির্ভরতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ডাকসেবাকেও কম খরচের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
ডাকসেবার কার্যক্রমের পাশাপাশি বুকিং চার্জ সংগ্রহেও মাসভেদে পার্থক্য দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ১৬ হাজার ৯৩৮ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ১৬ হাজার ৩৪৪ টাকা, মার্চে ১৩ হাজার ৩৮৮ টাকা, এপ্রিলে ১৮ হাজার ৮৪৮ টাকা, মে মাসে ১২ হাজার ৪৮০ টাকা, জুনে ৮ হাজার ৩০৬ টাকা, জুলাইয়ে ১৮ হাজার ১০৯ টাকা এবং আগস্টে ১৮ হাজার ৮৭৩ টাকা বুকিং চার্জ সংগ্রহ করা হয়েছে। আট মাসে মোট বুকিং চার্জ সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ২৮৬ টাকা।
কাজের চাপ বাড়লেও কুবি ডাকঘরের অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়ে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক বিভাগের পোস্টাল প্যাকার আবদুল মোমিন বলেন, “অনেকে মনে করেন, ডাক বিভাগে তেমন কোনো কাজ নেই। কিন্তু আমাদের সারাদিনই কাজ করতে হয়। বর্তমানে কাজের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, মাঝেমধ্যে দুপুরের খাবার খাওয়ারও সুযোগ হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “কাজের চাপ বাড়ার কারণে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আরও বড় একটি কক্ষ চেয়েছি। ডাকের জিনিসপত্র রাখার জন্য বর্তমান জায়গা যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করলে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারব। এছাড়া আমাদের জন্য কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই।”
কুবি ডাকঘরের সাব-পোস্টমাস্টার ফারহানা শারমিন লিজা বলেন, “প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চিঠি আগের তুলনায় কমেছে। এখন দাপ্তরিক চিঠিপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বিভিন্ন ধরনের পার্সেল বেশি আসে।”
তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো ডাকঘরের এসব সেবা সম্পর্কে অবগত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ব্যক্তিগত চিঠি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদনপত্র, বই কিংবা বিভিন্ন ধরনের পার্সেল দেশের যেকোনো প্রান্তে তুলনামূলক কম খরচে পাঠানোর সুযোগ আরও বেশি কাজে লাগানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের ডাকসেবার সামগ্রিক চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও পার্সেল, নথিপত্র, ই-কমার্স পণ্য ও দ্রুত ডাকসেবার চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে ডাকঘর এখন শুধু চিঠি আদান-প্রদানের কেন্দ্র নয়; বরং প্রয়োজনীয় নথি ও পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
কুমিল্লা ডাক বিভাগের আওতায়ও রয়েছে বিস্তৃত ডাক নেটওয়ার্ক। বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৫টি উপজেলা ডাকঘর, ৫৪টি উপ-ডাকঘর এবং ৭০২টি শাখা ডাকঘর রয়েছে। এসব ডাকঘরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ডাকসেবা গ্রহণ করছে।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও ডাকঘরের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি কমে যায়নি। বরং সেবার ধরন বদলে গিয়ে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকঘরের আট মাসের পরিসংখ্যানেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে চিঠিই ছিল ডাকঘরের প্রধান ব্যস্ততার কারণ, সেখানে এখন চিঠির পাশাপাশি পার্সেল, ডকুমেন্ট ও দ্রুত ডাকসেবাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে পূর্ণাঙ্গ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা চলছে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে একজন অ্যাডিশনাল আইজিপির

লালমনিরহাটে সমবায় সমিতি আইন ও বিধিমালা বিষয়ক ইনহাউজ প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও গাছের চারা বিতরণ

লালমনিরহাট জেলা ও উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে