
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের সোনাদিয়া দ্বীপে আবারও নির্বিচারে কাটা হচ্ছে ঝাউবন। উপকূলের বালিয়াড়ি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে ছোট-বড় কটেজ ও পর্যটন স্থাপনা। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা—ECA হিসেবে ঘোষিত এই দ্বীপে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ থাকলেও কার্যকর ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—কিছুদিন আগে প্রশাসনের যৌথ উচ্ছেদ অভিযানে ২৫টি অবৈধ কটেজ ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও পুনরায় ঝাউবন পরিষ্কার করে নতুন স্থাপনা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২৬ সালের মে মাসে জানিয়েছিল, সোনাদিয়া দ্বীপের ECA এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২৫টি রিসোর্ট উচ্ছেদ করা হয়েছে।
ঝাউবন শুধু গাছ নয়, উপকূলের প্রাকৃতিক প্রাচীর
সোনাদিয়ার ঝাউবনকে কেবল পর্যটকদের সৌন্দর্য উপভোগের জায়গা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। উপকূলীয় বালিয়াড়ি ও ঝাউবন বাতাস ও বালুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং উপকূলীয় পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
আরও বড় বিষয় হলো, সোনাদিয়ার পুরো বাস্তুতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বালিয়াড়ি, ম্যানগ্রোভ, কাদামাটি, লবণাক্ত জলাভূমি ও সৈকত—প্রতিটি আবাসস্থল বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রের সঙ্গে যুক্ত। গবেষণা ও সংরক্ষণমূলক নথিতে সোনাদিয়াকে পরিযায়ী পাখি, সামুদ্রিক কচ্ছপ, কাঁকড়া, মাছ ও বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কটেজ নির্মাণে হারাচ্ছে কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান
সোনাদিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এর দীর্ঘ বালুকাবেলা। এই সৈকত সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত NACOM-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সোনাদিয়ার দুটি হ্যাচারিতে ৯,০২৭টি অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল; সেগুলো থেকে ৬,৬৯৬টি বাচ্চা ফুটে বের হয়। অর্থাৎ দ্বীপটির সৈকত এখনো সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আবাসস্থল।
কিন্তু সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কটেজ, রিসোর্ট, অতিরিক্ত আলো, শব্দ ও মানুষের অবাধ চলাচল বাড়লে কচ্ছপের স্বাভাবিক ডিম পাড়ার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২০২৬ সালের মে মাসে কটেজ উচ্ছেদ অভিযানের সময় কোস্ট গার্ডও জানিয়েছিল, অবৈধ পর্যটন স্থাপনা, উচ্চ শব্দ ও অতিরিক্ত আলোকসজ্জা সামুদ্রিক কচ্ছপের nesting ground বা ডিম পাড়ার স্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে।
লাল কাঁকড়া ও পাখির আবাসস্থলেও আঘাত
সোনাদিয়ার বালুকাবেলা লাল কাঁকড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র। পাশাপাশি দ্বীপটি পরিযায়ী জলচর ও উপকূলীয় পাখির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
Key Biodiversity Areas Partnership-এর তথ্য অনুযায়ী, সোনাদিয়া দ্বীপে এমন কয়েকটি পাখির উপস্থিতি রয়েছে যেগুলো বৈশ্বিকভাবে সংরক্ষণ-গুরুত্বপূর্ণ—এর মধ্যে Great Knot, Spoon-billed Sandpiper এবং Spotted Greenshank রয়েছে।
অন্যদিকে সংরক্ষণসংক্রান্ত নথিতে সোনাদিয়াকে পরিযায়ী জলচর ও উপকূলীয় পাখির বিশ্রাম, খাদ্যগ্রহণ ও শীতকালীন আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফলে ঝাউবন কেটে সেখানে কটেজ নির্মাণ শুধু কয়েকটি গাছ হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের জায়গা এবং প্রজনন ও বিচরণের স্বাভাবিক পরিবেশ।
ECA ঘোষণা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর?
সোনাদিয়া দ্বীপকে সরকার ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা—ECA ঘোষণা করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বর্তমানে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬-ও সরকারি নীতিমালা হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ সোনাদিয়ার মতো সংবেদনশীল এলাকায় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকার কথা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ঘোষণার পরও অবৈধ স্থাপনা, বন উজাড়, দখল ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
২০২৬ সালের ৯ মে সোনাদিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম প্যারাবন এলাকায় যৌথ অভিযানে ২৫টি অবৈধ কটেজ ও বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা অংশ নেয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরও ওই অভিযানকে তাদের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে যে সোনাদিয়া ECA এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২৫টি রিসোর্ট সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
উচ্ছেদের পর আবারও নির্মাণ—তাহলে নজরদারি কোথায়?
প্রশ্ন উঠছে এখানেই।
একদিকে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে, অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে—অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও কোনো কোনো এলাকায় ঝাউগাছ ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ কেটে নতুন স্থাপনা তৈরির চেষ্টা চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু একদিনের উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগেই তা শনাক্ত করা, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং উচ্ছেদ করা জায়গায় পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা।
কারণ একটি কটেজ তৈরি হওয়ার পর সেটি উচ্ছেদ করা যতটা কঠিন, নির্মাণের আগেই ঝাউবন কেটে জমি পরিষ্কার করার পর্যায়ে সেটি বন্ধ করা অনেক সহজ।
সোনাদিয়া কি পর্যটনের জন্য, নাকি প্রকৃতির জন্য?
পর্যটনের সম্ভাবনা সোনাদিয়ার রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ECA এলাকার পর্যটন উন্নয়ন আর নির্বিচারে কটেজ নির্মাণ এক বিষয় নয়।
পরিকল্পনাহীন পর্যটন অবকাঠামো হলে পর্যটক বাড়লেও নষ্ট হবে সেই প্রকৃতি, যার আকর্ষণে মানুষ সোনাদিয়ায় যেতে চায়।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে সোনাদিয়ার পরিবেশগত সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দ্বীপটির বড় অংশের ম্যানগ্রোভ হারিয়ে যাওয়া, চিংড়িঘের ও অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিস্তারের কথা উঠে এসেছে।
অতএব, প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন গড়ে তোলা হলে সেটি শেষ পর্যন্ত পর্যটনেরই ভিত্তি দুর্বল করবে।
এখনই প্রয়োজন সমন্বিত সংরক্ষণ পরিকল্পনা
সোনাদিয়ার পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন—
– ঝাউবন ও বালিয়াড়ি এলাকায় নতুন স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা;
– ECA এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমানা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান করা;
– অবৈধ কটেজ ও রিসোর্টের তালিকা হালনাগাদ করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা;
– উচ্ছেদ করা জায়গায় পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী নজরদারি;
– সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান ও লাল কাঁকড়ার বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে সংরক্ষণ;
– পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলে শব্দ ও আলোকদূষণ নিয়ন্ত্রণ;
– পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা;
– স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রকৃতি-নির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত ইকোট্যুরিজমের কাঠামো তৈরি করা।
সোনাদিয়া শুধু মহেশখালীর একটি দ্বীপ নয়; এটি কক্সবাজার উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে একটি ঝাউগাছ কাটা মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়—এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বালিয়াড়ি, প্রাণীর আবাসস্থল ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ।
তাই প্রশ্ন এখন একটাই—উচ্ছেদ অভিযান কি শুধু স্থাপনা ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি উচ্ছেদের পর সেই জায়গা ও ঝাউবনকে রক্ষার জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সোনাদিয়াকে বাঁচাতে হলে শুধু অবৈধ কটেজ ভাঙলেই হবে না ; যে ঝাউবন কেটে কটেজ তৈরি হচ্ছে, সেই ঝাউবনকে বাঁচাতেই হবে। নইলে একদিন হয়তো কাগজে সোনাদিয়া ECA থাকবে, কিন্তু বাস্তবে হারিয়ে যাবে সেই প্রকৃতিই যার কারণে এলাকাটিকে ECA ঘোষণা করা হয়েছিল।





