নবীগঞ্জে খতনার পর তিন শিশুর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ

পল্লী চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ—খতনা করানোর বৈধতা, চিকিৎসাগত যোগ্যতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ৩নং ইনাতগঞ্জ বাজারে খতনা করানোর পর একই পরিবারের তিন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পল্লী চিকিৎসক, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক, তার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এবং খতনাকারীসহ চারজনের বিরুদ্ধে নবীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন শিশুদের বাবা মো. আকবর হোসেন। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে—অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের খতনা করার মতো চিকিৎসা-প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অনুমোদন ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৭ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকেল প্রায় ৪টার দিকে মো. আকবর হোসেন তার তিন ছেলে মাহিন আহমদ (১২), আদিল আহমদ (১০) ও মাহিদ আহমদ (৮)-কে খতনা করানোর জন্য ৩নং ইনাতগঞ্জ বাজারের গ্রিন লাইফ ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার তিন সন্তানের খতনা সম্পন্ন করা হয়। অভিযোগে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হিসেবে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মোজাহের রহমান (৪৫), তার ছেলে ইমরান রহমান (১৬), পল্লী চিকিৎসক সৌরভ বর্মন (৩৫) এবং খতনাকারী বাপ্পি সরকার (৪৮)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুদের বাবা অভিযোগ করেছেন, খতনা করার পর থেকেই তার তিন সন্তানের শারীরিক অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। বর্তমানে তারা অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একই পরিবারের তিন শিশুর ক্ষেত্রে জটিলতা—তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—একই দিনে একই পরিবারের তিন শিশুর খতনা করার পর তাদের শারীরিক জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। ফলে ঘটনাটি নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা, নাকি খতনা করার পদ্ধতি, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যবিধি, পরবর্তী চিকিৎসা বা অন্য কোনো কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে খতনার সময় কী ধরনের পদ্ধতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসাগত যোগ্যতা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—খতনা করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ ছিল কি না। অভিযোগে পল্লী চিকিৎসক ও খতনাকারীর নাম রয়েছে। কিন্তু তারা শিশুদের খতনা করার মতো প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের কোনো স্বীকৃত চিকিৎসাগত যোগ্যতা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রকাশ্যভাবে স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো ছিল কি না। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা—প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, নিবন্ধন, চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের কাগজপত্র এবং ঘটনার দিনের কার্যক্রমের তথ্য যাচাই করা। স্বাস্থ্যবিধি ও জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ খতনা একটি চিকিৎসা-প্রক্রিয়া। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সংক্রমণ প্রতিরোধে জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং যথাযথ চিকিৎসা-পদ্ধতি অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন শিশুর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ ওঠায় খতনার সময় ব্যবহৃত সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত ছিল কি না, প্রতিটি শিশুর জন্য যথাযথভাবে নতুন বা জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, প্রক্রিয়ার আগে ও পরে কী ধরনের পরিচর্যা করা হয়েছিল এবং কোনো সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। এ ছাড়া খতনার পর শিশুদের কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং জটিলতা দেখা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্টরা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকের অভিযোগ শিশুদের বাবা মো. আকবর হোসেন অভিযোগে বলেন, তিনি বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই তার অপ্রাপ্তবয়স্ক তিন সন্তানকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার দাবি, সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা-প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই খতনা করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, শিশুদের শারীরিক জটিলতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অভিযুক্তদের বক্তব্য কী? অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। তাদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে নেওয়া প্রয়োজন। এ প্রতিবেদনের সময় অভিযুক্তদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। পুলিশের বক্তব্য নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” পুলিশের তদন্তে শিশুদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও পরিচয়, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন, খতনার পদ্ধতি, ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং ঘটনার পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার। তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য। তিন শিশুর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার মতো একটি বিষয়। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের তিন শিশুর চিকিৎসাজনিত ভোগান্তির নয়; বরং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের খতনা বা অনুরূপ চিকিৎসা-প্রক্রিয়া কোথায়, কার মাধ্যমে এবং কী ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে সম্পন্ন করা হচ্ছে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। শিশুদের বর্তমান শারীরিক অবস্থার নিরপেক্ষ মেডিকেল পরীক্ষা, সংশ্লিষ্টদের যোগ্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন পর্যালোচনা করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তারা কোনো প্রতিশোধ নয়, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চান। একই সঙ্গে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম, অবহেলা বা অনুমোদনবিহীন চিকিৎসা কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হবে। এখন সবার নজর নবীগঞ্জ থানা পুলিশের তদন্তের দিকে—তিন শিশুর শারীরিক জটিলতার প্রকৃত কারণ কী, খতনা করার ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত নিয়ম ও স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা হয়েছিল এবং অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের দায়িত্ব বা সংশ্লিষ্টতা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই মিলবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

যশোরে বদ্ধ ঘর থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার, রহস্য

যশোরের অভয়নগরের একতারপুর গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে জাফর নামে এক যুবকের গলায় ফাঁস দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করেছে প্রতিবেশিরা। বুধবার বেলা ১২টায় এ ঘটনা ঘটে। ‎স্থানীয়রা জানান, জাফরের সঙ্গে তার স্ত্রীর দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কলহ চলছিল।