বর্ষার প্রথম দফার বৃষ্টি নামলেই বদলে যায় পিরোজপুরের কাউখালীর চিত্র। খাল-বিল, নদ-নদী ও জলাশয়ে নতুন পানির প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে শুরু করে দেশীয় মাছ। আর মাছের এই মৌসুমি প্রাচুর্যের সঙ্গে প্রাণ ফিরে পায় উপজেলার দক্ষিণ বাজারের ঐতিহ্যবাহী চাই-দুয়ারি হাট। প্রতি শুক্রবার ও সোমবার বসা এই হাটে এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে ভিড় করছেন মাছ শিকারি, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা।
স্থানীয়দের মতে, অন্তত কয়েক প্রজন্ম ধরে এই হাট দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চাই-দুয়ারির বাজার হিসেবে পরিচিত। বর্ষা মৌসুম এলেই এখানে লাখ টাকার লেনদেন হয়। একসময় এই হাটের তৈরি চাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হতো। আধুনিক মাছ ধরার সরঞ্জামের প্রসার এবং দেশীয় মাছের সংকটের কারণে সেই জৌলুস কিছুটা ম্লান হলেও বর্ষা এলে এখনও হাটটি তার পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্যের অনেকটাই ফিরে পায়।
একটি শিল্প, হাজারো পরিবারের জীবিকা
কাউখালী, ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ, নাজিরপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাই ও দুয়ারি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। বর্ষার প্রায় ছয় মাস এই কুটিরশিল্পই তাদের প্রধান আয়ের উৎস।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় বিভিন্ন জাতের বাঁশ কেটে, শুকিয়ে ও বিশেষ কৌশলে বুনে তৈরি করা হয় চাই ও দুয়ারি।
একটি বাঁশ থেকে সাধারণত সাত থেকে আটটি চাই তৈরি করা সম্ভব। একজন দক্ষ কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টি চাই বা দুয়ারি তৈরি করতে পারেন। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই এই কাজে অংশ নেন, ফলে এটি গ্রামীণ পারিবারিক অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হাটে বর্তমানে আকার ও মানভেদে এক কুড়ি (২০টি) চাই তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতিটি চাইয়ের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। এসব চাই দিয়ে পুঁটি, টেংরা, খলিসা, কৈ, শিং, মাগুর, গুতুম, চিংড়িসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরা হয়।
কারিগরদের অভিযোগ, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন ব্যয়। ফলে বিক্রি বাড়লেও লাভের পরিমাণ আশানুরূপ নয়।
স্থানীয় কারিগরদের একজন বলেন, “আগে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই অর্ডার আসত। এখন চাহিদা কিছুটা বাড়লেও আগের মতো বাজার নেই। জলাশয় কমে গেছে, মাছও কমেছে। সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমরা এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে পারব।”
জলাশয় হারাচ্ছে, কমছে দেশীয় মাছ
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল-বিল ভরাট, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, জলাশয় দখল, দূষণ এবং কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চাই-দুয়ারি শিল্পেও।
কাউখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, “মে থেকে জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা মাছ ও পোনা সংরক্ষণে জেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনা বিতরণ এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কারেন্ট জালের নির্বিচার ব্যবহার শুধু দেশীয় মাছ নয়, পুরো জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।
কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “চাই একটি ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার উপকরণ। তবে এটি অবশ্যই প্রচলিত আইন ও পরিবেশগত নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ছোট মাছ বা পোনা নিধন হয়—এমন উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না। নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাই-দুয়ারি শুধু মাছ ধরার একটি উপকরণ নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ কারুশিল্প ও টেকসই জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। জলাশয় সংরক্ষণ, দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষা, কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আবারও নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বর্ষার জলে তাই কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট কেবল একটি বাজার নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, লোকজ ঐতিহ্য এবং দেশীয় মৎস্যসম্পদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।




