বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর জলে রঙিন ফুল, মঙ্গল কামনায় শুরু হলো ফুল বিজু-বিষু

বান্দবানের পাহাড় আর সাঙ্গু নদীর বুকে আজ ভোর থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের রঙিন আলো। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়ে বর্ষবিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছেন।
ভোরের প্রথম আলোয় সাঙ্গু নদীর তীরে জড়ো হন সম্প্রদায়ের মানুষেরা। বন থেকে সংগ্রহ করা বিজু ফুল, মাধবীলতা, রঙ্গন ও নানা রঙের বুনো ফুল কলাপাতায় সুন্দর করে সাজিয়ে তারা নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দেন। এই ফুল বিজু (চাকমা) ও ফুল বিষু (তঞ্চঙ্গ্যা) অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জলবুদ্ধ ও মা গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে পূজা করা হয় এবং অতীতের ভুল-ভ্রান্তি, দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে মুছে ফেলে আগামী দিনের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
অংশগ্রহণকারী সিদ্ধার্থ চাকমা বলেন, “জলবুদ্ধ ও মা গঙ্গাদেবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন বছরের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছি। যেন সবার জীবন হয় শান্তিময় ও সমৃদ্ধ।” তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নাজিব তঞ্চঙ্গ্যা জানান, “প্রতি বছরের মতো এবারও সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সূচনা করেছি। এটি আমাদের সংস্কৃতির গভীর অংশ।”
বিজু-বিষু উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রাম বান্দরবান রাংগামাটি খাগড়াছড়ির চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চাকমারা একে বিজু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসু নামে পালন করেন। সবগুলোকে একসঙ্গে বৈসাবি উৎসব বলা হয়। এই উৎসব শুধু বর্ষবরণ নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও প্রতীক।
তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আজ প্রথম দিন ফুল বিজু/বিষু। আগামীকাল (১৩ এপ্রিল) মূল বিজু/বিষু দিনে ঘরে ঘরে ২০-৩০ রকমের সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী পাজন রান্না হবে, নতুন পোশাক পরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। তৃতীয় দিন (১৪ এপ্রিল) নতুন বছরের প্রথম দিনে ধর্মীয় প্রার্থনা, শুভেচ্ছা বিনিময় ও আনন্দ-উৎসবে সমাপ্তি ঘটবে।
সাঙ্গু নদীর স্বচ্ছ জলে ভাসমান রঙিন ফুলের দৃশ্যে আজ পুরো বান্দরবান যেন নতুন বছরের আনন্দে মেতে উঠেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এই উৎসব সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা।
এই বর্ণিল উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে এবং সকলকে নতুন বছরের স্বপ্ন ও আশায় উদ্দীপিত করেছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন