শেরপুরে হামলার শিকার হয়ে বন্ধ দোজা পীরের দরবার

একসময় এখানে বসত ভক্তদের মিলনমেলা। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন অনুসারীরা। ধর্মীয় আয়োজন, জিকির-আজকার আর মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। চারপাশে ছিল সবুজের সমারোহ, পাখির কলকাকলি আর উৎসবমুখর পরিবেশ। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র এখন যেন শুধুই স্মৃতি।
শেরপুর সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নের মুর্শিদপুরে অবস্থিত খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার ওরফে দোজা পীরের দরবার শরীফ। স্থানীয়দের কাছে একসময় এটি ছিল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সমাগমের অন্যতম পরিচিত স্থান। তবে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দরবারের কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে দরবারের বিভিন্ন স্থানে গবাদিপশুর বিচরণ দেখা যায়। সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমাম হোসেন বলেন, পরিত্যক্ত হয়ে পড়া জায়গাটির বিভিন্ন অংশ এখন গবাদিপশুর বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, “যে স্থানে একসময় মানুষের ধর্মীয় আবেগ, বিশ্বাস ও সমাগম ছিল, আজ সেটি অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।”
হামলা-ভাঙচুরের পর বন্ধ কার্যক্রম
দরবার শরীফের খাদেমের দাবি, একসময় বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখানে মানুষের ঢল নামত। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতেন। রাতভর চলত ধর্মীয় আয়োজন। চারপাশে বিরাজ করত উৎসবের আমেজ।
তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরের সংঘাতের পর বদলে যায় সেই চিত্র।
খাদেম অভিযোগ করে বলেন, “তৌহিদী জনতার নামে হামলা চালিয়ে দরবার শরীফের মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। দরবারে থাকা বিপুল পরিমাণ মালামালও লুট করা হয়েছে।”
তার দাবি, প্রশাসনের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের পুনরায় দরবারের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হোক।
দরবারের অনুসারী সাঈদ আনোয়ার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই দরবার শরীফে আসেন। তার দাবি, “আমার জানামতে এখানে কোনো শরিয়তবিরোধী কার্যক্রম হতো না। এখানে একটি মসজিদ রয়েছে। সেখানে নামাজ পড়তাম এবং জিকির-আজকার করতাম। প্রায় দুই বছর ধরে দরবারটি বন্ধ।”
তিনি আরও বলেন, “প্রশাসন ও সরকারের কাছে আমাদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দরবারটি পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করা হোক।”
সংঘাতের সূত্রপাত
স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এলাকাবাসী ও দরবারের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে সেই বিরোধ ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ভোরে মুর্শিদপুর দরবার শরীফে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুই পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হন এবং পুলিশ সাতজনকে আটক করে বলে জানা যায়।
দরবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষকসহ কয়েকশ মানুষের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করা হয়। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি ছিল, আপস-মীমাংসার কথা বলে তাদের ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সংঘর্ষে আহত হাফেজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তার মৃত্যুর পর ২৮ নভেম্বর আবারও দরবার শরীফে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায় এবং সেখানে থাকা গবাদিপশু ও বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করা হয়।
ফিরে আসবে কি সেই পুরোনো চিত্র?
দরবারের খাদেম জব্বার আলী বলেন, “দরবার শরীফকে ঘিরে একসময় যে ধর্মীয় সমাগম, মানুষের পদচারণা ও উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল, তা এখন অতীতের স্মৃতি। সংঘাত, বিরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞের পর দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে দরবারের কার্যক্রম। আমরা চাই দরবারের জায়গাটি আবার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসুক।”
অন্যদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ চান, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত হয়ে থাকা জায়গাটিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হোক।
আর দরবারের অনুসারীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে এনে তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়া হোক।
একসময় ভক্তদের পদচারণা, ধর্মীয় আয়োজন আর পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকা দোজা পীরের দরবার এখন অনেকটাই নীরব। দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা এই দরবারকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন—কবে কাটবে এই অচলাবস্থা, আর কবে ফিরবে সেই পুরোনো মিলনমেলা?

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন