
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে একটি কার্যক্রম থেমে যেতে পারে, কিন্তু একটি জাতির নৈতিকতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গঠনের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে প্রকল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারের রাজস্ব খাতের আওতায় স্থায়ী করার জোর দাবি উঠেছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় পার্বতীপুর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মাসিক সমন্বয় সভায় এ দাবি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের সুপারভাইজার মোঃ শামসুল আলম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মডেল কেয়ারটেকার মোঃ সারাফাতউল্লাহ, জিসি ডাক্তার হাফেজ মাওলানা মোঃ মশিউর ইসলাম, জিসি মোহাম্মদ আনিসুর রহমান এবং জিসি মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন। সভায় পার্বতীপুর উপজেলার নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতাধীন শিক্ষক-শিক্ষিকারা অংশগ্রহণ করেন।
শুধু শিক্ষা নয়, মানুষ গড়ার কার্যক্রম
সভায় বক্তারা বলেন, শিশুর শৈশবই তার ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় একজন শিশু যে শিক্ষা, পরিবেশ ও মূল্যবোধের মধ্যে বেড়ে ওঠে, তার প্রভাব পরবর্তী জীবনে বহুলাংশে প্রতিফলিত হয়।
তারা বলেন, শুধু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই একটি আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে না। শিক্ষার পাশাপাশি সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি থেকে যায়।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কারণ একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেও তার মধ্যে সততা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাকলে সেই শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারে না।
তাদের মতে, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম কেবল ধর্মীয় পাঠদান নয়; এটি শিশুদের চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ।
শিক্ষকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সমন্বয় সভায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি একজন শিশুর চিন্তা, চেতনা ও চরিত্র গঠনের অন্যতম পথপ্রদর্শক।
তারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা ও নিয়মিত পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী কেন অনুপস্থিত থাকছে, কেন ঝরে পড়ছে কিংবা পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কমে যাচ্ছে—এসব বিষয়েও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রযুক্তির যুগে নৈতিক শিক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জ
সভায় বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সমাজব্যবস্থার বাস্তবতাও আলোচনায় আসে। বক্তারা বলেন, আজকের শিশুরা এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে তথ্যের প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব থেকেও শিশুদের সুরক্ষা দিতে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শিশুদের সঠিক পথে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ, নৈতিক বিচারবোধ এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার সক্ষমতা তৈরি করা। আর এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্প নয়, চাই স্থায়ী রাজস্ব কাঠামো
সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে প্রকল্পভিত্তিক অবস্থা থেকে বের করে সরকারের রাজস্ব খাতের আওতায় নেওয়ার দাবি।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশে এ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রকল্পভিত্তিক কাঠামোর কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
তারা বলেন, যে কার্যক্রম একটি প্রজন্মের চরিত্র গঠন এবং সমাজে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে, সেটিকে সাময়িক প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
বক্তাদের দাবি, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে রাজস্ব খাতভুক্ত করা হলে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে কার্যক্রমের পরিকল্পনা, তদারকি ও সম্প্রসারণ আরও কার্যকর, সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গঠনে এ কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
‘নৈতিকতার প্রয়োজন প্রকল্পের মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়’
সভায় আলোচকদের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়—নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়।
তাদের মতে, একটি প্রকল্পের নির্দিষ্ট শুরু ও শেষ থাকতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
তাই আগামী প্রজন্মকে শুধু কর্মক্ষম নয়, নৈতিক ও মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হলে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনতে হবে বলে মত দেন বক্তারা।
পার্বতীপুর থেকে জাতীয় প্রত্যাশা
সমন্বয় সভা থেকে উঠে আসা দাবি শুধু পার্বতীপুরের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন নয়; এটি শিশুদের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত—এমন মত সংশ্লিষ্টদের।
তাদের প্রত্যাশা, সরকার মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের সামগ্রিক গুরুত্ব মূল্যায়ন করে এটিকে প্রকল্পের গণ্ডি থেকে বের করে একটি স্থায়ী ও টেকসই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে পরিণত করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা বড় বড় স্থাপনায় পরিমাপ করা যায় না। সেই সমাজের মানুষ কতটা সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল—তার ওপরও নির্ভর করে উন্নয়নের প্রকৃত মান।
আর সেই মানুষ গড়ার কাজটি শুরু হয় শিশুর হাত ধরে।
পার্বতীপুরের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের এই মাসিক সমন্বয় সভা তাই শুধু একটি নিয়মিত সভা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিকতার আলোয় গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কার্যক্রমকে প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে স্থায়ী রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনার দাবিরও প্রতিধ্বনি।



