চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাতের পৃথক সময় ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটি। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে জমিয়তুল ফালাহ জামে মসজিদ মাঠে সকাল ৮টায় এবং এমএ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাতে সভাপতিত্ব করবেন সিটি মেয়র, পরের জামাতে জেলা প্রশাসক। বছরের পর বছর ধরে দুটি সংস্থার পাল্টাপাল্টি ‘প্রধান ঈদ জামাত’ নিয়ে অলিখিত ‘দ্বন্দ্ব’ চলে আসছে। মাত্র আধা কিলোমিটারের মধ্যে দুটি জামাতকেই প্রধান ঈদ জামাত হিসেবে দাবি করে আসছেন আয়োজকরা।
শুধু প্রধান ঈদ জামাতই নয়, দুই কমিটির আয়োজনে নগরজুড়ে আয়োজন করা হয় পৃথক আরও কয়েকটি ঈদ জামাতের। সিটি করপোরেশন তার আওতাধীন ৪১টি ওয়ার্ডে অবস্থিত সিটি করপোরেশন মসজিদগুলোয় আলাদা ঈদ জামাত আয়োজন করে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির আওতাভুক্ত নগরীর আরও ৯৪টি আঞ্চলিক ঈদগাহে ঈদের নামাজ আয়োজন করা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, সকাল ৮টায় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এতে ইমামতি করবেন মসজিদের খতিব মাওলানা আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করবেন প্রধান পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা আহমদুল হক।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান ঈদ জামাত এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের সম্মুখস্থ জিমনেসিয়াম মাঠে সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। নামাজে ইমামতি করবেন বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মাওলানা অধ্যক্ষ ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আবু নোমান।দ্বন্দ্বের শুরু যেভাবে: চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির আজীবন সদস্য, মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান কালবেলাকে বলেন, প্রবীণ আইনজীবী কামাল উদ্দিন আহমদ খান এই ঈদ জামাতের উদ্যোক্তাদের অন্যতম। তিনি আমৃত্যু সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে এই কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। পদাধিকার বলে ঈদ-জামাত কমিটিতে বিভাগীয় কমিশনার কিংবা জেলা প্রশাসক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কামাল এ খান ১৯৫২ ও ৫৮ সালে তৎকালীন মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (বর্তমান সিটি করপোরেশন) কমিশনার ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর অধ্যক্ষ আবদুল করিম এটার সেক্রেটারি হন। বর্তমানে তার জামাতা সালেহ আহমেদ সুলেমান ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন।
এভাবেই চলে আসছিল চট্টগ্রামের প্রধান ঈদ জামাত। এসব জামাতে তৎকালীন মন্ত্রী-এমপি, চেয়ারম্যান, শিল্পপতিসহ সাধারণ মানুষ অংশ নিতেন বলে কেন্দ্রীয় ঈদ জামাতের আলাদা আকর্ষণ ছিল। তবে চট্টগ্রামে কোনো কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং ঈদগাহ না থাকায় স্টেডিয়ামে ঈদ জামাত আয়োজন নিয়ে অনেকের মধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্কিট হাউস সংলগ্ন ১২ একর সরকারি জমি মাত্র ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ তৈরির জন্য বন্দোবস্ত দেন। পরে এরশাদ সরকারের শাসনামলে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে, যেটি এখন চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদ।
এরশাদ সরকারের শাসনামলের শেষ দিকে তৎকালীন সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী জেলা প্রশাসক তোফায়েল আহমদকে ডেকে প্রধান ঈদ জামাত আয়োজন সিটি করপোরেশনের অধীনে করার প্রস্তাব দেন এবং একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের বদলে পদাধিকারবলে সিটি মেয়রই এটির সভাপতি হবেন বলে জানান। কিন্তু সে বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটির প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নগরের প্রধান সেবা সংস্থা হিসেবে আমি বৃহৎ আকারে এটি আয়োজনের উদ্যোগ নিই। তৎকালীন ডিসি এটি নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরির চেষ্টা করেন। আমি রাষ্ট্রপতিকে (এরশাদ) অনুরোধ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করাতে সমর্থ হই, যেখানে উল্লেখ করা হয়—দেশের সব জেলা শহরে প্রধান ঈদ জামাত আয়োজন করবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দেশনা পেয়ে ১৯৮৯ সালে দ্রুত ঈদ জামাতের মাঠ প্রস্তুতের উদ্যোগ নিই। তখন ঈদ জামাত কমিটির সঙ্গে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানে একসঙ্গে জামাত আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠে, নামাজ পড়াবেন কে? কমিটির পক্ষ থেকে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল আহাদ মাদানির নাম প্রস্তাব করা হয়; সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব মাওলানা জালালুদ্দিন আলকাদেরির নাম প্রস্তাব করা হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয় জালালুদ্দিন আলকাদেরি খুতবা দেবেন, আবদুল আহাদ মাদানি নামাজ পড়াবেন।’
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, ঈদগাহ নিয়ে। মসজিদের পাশেই ছিল পুকুর। এ পুকুরে আশেপাশের লন্ড্রির কাপড় ধোয়া হতো, ফলে মাঠ ছিল সংকীর্ণ। এ মাঠে বড় জামাত আয়োজন কষ্টকর হয়ে পড়বে। আমি তৎক্ষণাৎ সে পুকুর ভরাটের উদ্যোগ নিলাম। এক মাসের মধ্যেই পুকুরটি ভরাট করে মাঠে রূপ দিতে সম্মত হই। অবশ্য এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমাকে আইনি ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে। দরপত্র ছাড়া এবং সিটি করপোরেশনের টাকায় কেন পুকুর ভরাট করা হলো তা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তখন পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্ম হয়নি। কিন্তু মামলায় জিতে যাই। মাঠ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সে বছরই (১৯৮৯) প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় প্রধান ঈদ জামাতের।’
দুটি জামাত যেভাবে ‘প্রধান’ হলো: পরের বছর, ১৯৯০ সালে জমিয়তুল ফালাহ মাঠে একই নিয়ম অনুসরণ করে প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সে বছরের শেষ দিকে (৬ ডিসেম্বর) গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে মেয়রের দায়িত্ব যায় বিভাগীয় কমিশনারের হাতে। তখন কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটি আবারও এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে ঈদ জামাতের আয়োজন শুরু করেন। অন্যদিকে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠেও নামাজ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলেও মেয়র নিয়োগ দেন (১৯৯৩ সালে) মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনকে। কিন্তু, তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আয়োজনে ঈদ জামাতকে আর ভেঙে দেননি। ফলে ১৯৯১ সাল থেকে একই সঙ্গে দুটি প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।’



