দেশের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম গতিশীল করতে এবং নির্বাচনি সরঞ্জামাদির নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘নির্বাচনি ডাটাবেজের জন্য উপজেলা/থানা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসারের কার্যালয় ও সার্ভার স্টেশন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ফেরত দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ থেকে এই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উত্থাপন করা হয়।
বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর সচিবালয়ে কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হওয়া একনেক বৈঠক থেকে প্রকল্পটি ফেরত দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
একনেকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯২ কোটি ৮৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১টি আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস ও ৩টি জেলা নির্বাচন অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ৪৫টি উপজেলা নির্বাচন অফিস ও সার্ভার স্টেশন নির্মাণসহ মেট্রোপলিটন থানাগুলোর জন্য ১৬টি ফ্লোর-স্পেস ক্রয় করা হবে। মূলত ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন শুরু হওয়ার পর থেকে যে জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে, সেটিকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করতেই এই উদ্যোগ। এর আগে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অধিকাংশ উপজেলায় সার্ভার স্টেশন নির্মিত হলেও ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও নতুন উপজেলা গঠিত হওয়ার কারণে যে ৬৫টি এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামো ছিল না, বর্তমান প্রকল্পের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে।
কমিশন আরও জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় কেবল ভবন নির্মাণই নয়, বরং ভূমি অধিগ্রহণ, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সরঞ্জামাদিও ক্রয় করা হবে। আধুনিক এই সার্ভার স্টেশনগুলো নির্মিত হলে ভোটার তালিকা নিয়মিত হালনাগাদকরণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নাগরিক সেবা আরও দ্রুততর হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম মেশিন, ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য নির্বাচনি মালামাল সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ অবকাঠামোগত সুযোগ তৈরি হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বশেষ রেট শিডিউল অনুযায়ী ব্যয় প্রাক্কলন করার ফলে আগের তুলনায় প্রকল্পের কিছুটা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব উপজেলায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হবে : গাজীপুর সদর, লৌহজং, সালথা, ডাসার, কালুখালী, টুঙ্গীপাড়া, তারাকান্দা, ধনবাড়ী, শাহজাহানপুর, নলডাঙ্গা, চৌহালী, ফুলছড়ি, বিরল, তালতলী, রাঙাবালি, ইন্দুরকানী, কয়রা, মুজিবনগর, সদর দক্ষিণ, লালমাই, মেঘনা, তিতাস, মনোহরগঞ্জ, আশুগঞ্জ, বিজয়নগর, হাইমচর, মতলব উত্তর, কমলনগর, সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, কবিরহাট, সোনাইমুড়ি, সুবর্ণচর, কর্ণফুলি, সন্দ্বীপ, পেকুয়া, ঈদগাঁও, গুইমারা, ওসমানীনগর, দক্ষিণ সুরমা, শায়েস্তাগঞ্জ, জুড়ী, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, মধ্যনগর। এছাড়া উত্তরা, কোতোয়ালী, লালবাগ, সূত্রাপুর, সবুজবাগ, মতিঝিল, টঙ্গী, বোয়ালিয়া, রাজপাড়া, সোনাডাঙ্গা, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম পোর্ট, ডবলমুরিং, কোতোয়ালী থানা নির্বাচন অফিস।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য যেসব জেলা ও আঞ্চলিক নিবাচন অফিস নির্ধারণ করা হয়েছে: ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, খুলনা, মেহেরপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ। এছাড়া ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সচিব ড. কাইয়ুম আরা বেগম প্রকল্পটির বিষয়ে জানান, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে। যথাযথ অবকাঠামো নিশ্চিত হলে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও নির্ভুল নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য ভবনসমূহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করবে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপজেলা পর্যায়ে সরকারি সেবা প্রদান এবং তথ্যভান্ডারের সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় তিনি জনভোগান্তি লাঘব এবং সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। একনেক বৈঠকে থাকা এক কর্মকর্তা প্রকল্পটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়ে বিস্তারিত জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের জন্য আলাদা আলাদা ভবন নির্মাণ না করে একটি বড় ও সমন্বিত ভবন নির্মাণ করতে হবে। উপজেলার সকল সরকারি অফিস থাকবে একই ভবনের ভেতরে। এই এক ছাদের নিচ থেকেই নাগরিকরা যেন তাদের প্রয়োজনীয় সকল সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতে একদিকে যেমন সরকারি জমির সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছোটাছুটি করতে হবে না।
নির্বাচন কমিশনের ডেটা সেন্টারের অবস্থান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টারগুলো কেন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে? একবার শোনা যায় আইসিটি ভবনে, আবার বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনে, এভাবে বিভিন্ন জায়গায় কেন রাখা হচ্ছে? একটি নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত জায়গায় সমন্বিতভাবে ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা প্রয়োজন।



