
তীব্র আর্থিক দেউলিয়াত্ব, কোটি টাকার দেনা আর কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের অনিশ্চয়তা—একসময় এ নিয়েই ধুঁকছিল বান্দরবানের লামা পৌরসভা। তবে সেই স্থবির চিত্র এখন অতীত। সুশাসন, প্রশাসনিক সততা ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের জোরে লামা পৌরসভা আজ ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আর এই আমূল পরিবর্তনের মূল কারিগর হিসেবে নজর কেড়েছেন পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন।
অপচয় বন্ধ ও দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কঠোর তদারকি ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করেন প্রশাসক। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বিগত ১৬ বছর ধরে ঝুলে থাকা সরকারি জিপিএফ (GPF) ও সিপিএফ (CPF) ফান্ডের ২৯ লাখ টাকা সফলভাবে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে অপ্রয়োজনীয় ১৮টি বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিশোধ করা হয়েছে বকেয়া ১২ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল। এছাড়া বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (BMDF)-এর ৯ লাখ টাকা ঋণ এবং জন্মনিবন্ধন ফি বাবদ বকেয়া ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করে পৌরসভাকে বড় ধরনের দায়ের হাত থেকে মুক্ত করা হয়েছে।
অবসান ঘটেছে বেতন বকেয়ার, মানবিকতার ছোঁয়া
পূর্বে ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত কর্মচারীদের বেতন আটকে থাকা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, যা তাঁদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তবে বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বকেয়া নেই; প্রতি মাসেই নিয়মিত বেতন দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রয়াত এক কর্মকর্তার পরিবারের বকেয়া পাওনা বাবদ নগদ ৯ লাখ টাকা প্রদানের ফাইল অনুমোদন করে চরম মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান প্রশাসন।
রাজস্ব আদায়ে অভাবনীয় সাফল্য
স্বচ্ছতা ও কঠোর রাজস্ব নীতির কারণে আয়ের মুখ দেখেছে পৌরসভা:
হোল্ডিং ট্যাক্স: ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আদায় ৫৮ লাখ ২১ হাজার ৮০৪ টাকা।
ট্রেড লাইসেন্স ও সনদ: ট্রেড লাইসেন্স থেকে ১০ লাখ এবং বিভিন্ন সনদ ফি বাবদ আদায় ৪ লাখ টাকা।
ইজারা ও ভাড়া: দোকান ভাড়া বাবদ ৭ লাখ টাকা এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৯ লাখ টাকায় ইজারা প্রদান।
ভূমি উন্নয়ন কর: ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা এবং চলতি বছরের মাত্র তিন মাসেই আদায় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা।
সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন
পৌর প্রশাসনের এ পরিবর্তন শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক বিলছড়ি সিলেটি পাড়া জামে মসজিদের সার্বিক উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪ নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান পাড়া এলাকার পানির টাংকি মসজিদের চাল মেরামতেও পৌরসভা সরাসরি আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছে।
প্রতিক্রিয়া:
পৌরসভার কর নির্ধারক নুর মোহাম্মদ বলেন, “প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অপচয় রোধের মাধ্যমে একটি ঋণগ্রস্ত সংস্থাকে স্বাবলম্বী করা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
আবার পৌরসভার দারোয়ান রাজিব মল্লিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আগে মাসের পর মাস বেতন পেতাম না। এখন প্রতি মাসে নিয়মিত বেতন পাওয়ায় পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে আছি।”
সাত দপ্তরের দায়িত্ব সামলে অনন্য দৃষ্টান্ত
২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যোগদান করার পর থেকে মো. মঈন উদ্দিন একযোগে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর প্রশাসক, ইউপি প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি), রেজিস্ট্রেশন অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট—এই সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দক্ষতা ও সততার সাথে পালন করে আসছেন।
নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পৌর প্রশাসক ও ইউএনও মো. মঈন উদ্দিন বলেন,
“জনগণের সেবা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য, আমি কেবল অর্পিত দায়িত্বটুকু সততার সাথে পালনের চেষ্টা করেছি। পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা এবং সাধারণ নাগরিকদের সময়মতো ট্যাক্স পরিশোধের কারণেই আজকের এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।”




