ঐতিহ্যের আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা, শুরু হয়েছে প্ল্যাটফর্মের মাপজোক

ঐতিহ্যের সাক্ষী আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন এবার আধুনিকায়নের নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের যাত্রী দুর্ভোগ কমাতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বৃদ্ধি, দৈর্ঘ্য সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগের একটি বিশেষ টিম স্টেশনে এসে প্রাথমিক মাপজোক করেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে পাকশী রেলওয়ের কর্মকর্তাদের একটি দল আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনে এসে প্ল্যাটফর্ম, রেললাইন ও বিদ্যমান অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ পরিমাপ করেন। এ সময় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের বর্তমান দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা, ট্রেনের অবস্থান এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সম্ভাব্য জায়গাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দীর্ঘ আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রাথমিকভাবে এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। সম্ভাব্য পরিকল্পনায় আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মকে ১৮ থেকে ২২ বগির আন্তঃনগর ট্রেন ধারণের উপযোগী করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এজন্য প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এক প্ল্যাটফর্মে আসবে পুরো ট্রেন, কমবে যাত্রী দুর্ভোগ

বর্তমানে দীর্ঘ ট্রেন স্টেশনে থামলে অনেক সময় ট্রেনের সামনের কিংবা পেছনের কয়েকটি বগি প্ল্যাটফর্মের বাইরে অবস্থান করে। এতে বিশেষ করে বয়স্ক, নারী, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের ওঠানামায় দুর্ভোগ ও ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য বাড়ানো গেলে দীর্ঘ আন্তঃনগর ট্রেনের অধিকাংশ কিংবা পুরো কোচ প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা সম্ভব হবে। ফলে রাতের বেলা বা ব্যস্ত সময়ে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীদের যে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে হয়, তা অনেকটাই কমে আসতে পারে।

একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা ট্রেনের দরজার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ব্রডগেজ ট্রেনের উপযোগী করে প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা প্রায় ৭৬০ মিলিমিটার করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

১৮৬২ সালের ঐতিহ্য, আধুনিকায়নে থাকছে বিশেষ সতর্কতা

আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু এর যাত্রীসেবা নয়—এর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ১৮৬২ সালে নির্মিত স্টেশন ভবনটি উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশন ভবনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

তাই আধুনিকায়নের সম্ভাব্য পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক ভবনের মূল কাঠামো ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজন হলে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা অক্ষত রেখেই আধুনিক প্রকৌশল পদ্ধতিতে প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ ও অন্যান্য উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

২ নম্বর প্ল্যাটফর্মেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন

শুধু প্রধান প্ল্যাটফর্ম নয়, ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের আধুনিকায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, উন্নত আলোকসজ্জা এবং যাত্রী চলাচলের সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

সম্ভাব্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় হুইলচেয়ার ও মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে র‌্যাম্প বা লিফট সুবিধাসহ আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রসারিত প্ল্যাটফর্মে আধুনিক ডাবল শেড এবং উচ্চক্ষমতার এলইডি আলোক ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।

শুধু আলমডাঙ্গা নয়, সুবিধা পেতে পারে কয়েক জেলার মানুষ

আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন শুধু স্থানীয় যাত্রীদের জন্য নয়; চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরের গাংনী এবং ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগের কেন্দ্র।

চিত্রা, সুন্দরবন ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ হওয়ায় প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। ফলে স্টেশনটির অবকাঠামো আধুনিক হলে এর সুফল শুধু আলমডাঙ্গা নয়, আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও পেতে পারেন।

মাপজোকের পর এখন অপেক্ষা সিদ্ধান্তের

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক মাপজোক ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর কারিগরি মূল্যায়ন, নকশা প্রণয়ন, অর্থের সংস্থান এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো পরবর্তী ধাপ রয়েছে। অর্থাৎ মাপজোক শুরু হলেও এখনই এটিকে চূড়ান্ত উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থাকা আলমডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের এই প্রাথমিক পরিমাপকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঐতিহাসিক স্থাপনার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত আধুনিকায়ন পরিকল্পনা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

ঐতিহ্য থাকবে, বদলাবে যাত্রীসেবা—আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের প্রাথমিক মাপজোক তাই স্থানীয়দের মনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এখন অপেক্ষা, সম্ভাব্যতার এই মাপজোক কবে বাস্তব উন্নয়ন পরিকল্পনায় রূপ নেয়।

 

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন