নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা: নিহত ২২, নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক

নেপালের রাসুয়া ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে আজ বুধবার এর আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে পৌঁছেছে। এখনো নিখোঁজ আছেন কয়েকশো মানুষ, যাদের বড় অংশই বিদেশি পর্যটক। খারাপ আবহাওয়া উদ্ধারকাজ ব্যাহত করছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ভোটে কোশি নদীতে হিমালয় থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নামলে এ বন্যা শুরু হয়। বন্যায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গেছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদকে জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প হয়। এর ফলে হিমবাহে ধস নামে এবং সেখান থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিকমত সিং আয়ের বিবিসি নেপালিকে জানান, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৮৪ জন পর্যটকের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। বিদেশিদের বড় অংশই তিব্বতের কৈলাশ মানসরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ১২ জন ব্রিটিশ, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান, ৩ জন মার্কিন, ১ জন অস্ট্রেলীয় ও ১ জন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, তাদের অন্তত ৮ জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব নাগরিক এলাকাটিতে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপাল পুলিশ জানায়, বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে রাসুয়ায় ১ জন, নুয়াকোটে ৭ জন, ধাদিংয়ে ৬ জন ও গোর্খায় ৪ জন মারা যান। পরে হালনাগাদ হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। রাসুয়ার তিমুরে থেকে নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৩২ জন সদস্য এখনো নিখোঁজ।

২০ মেগাওয়াটের লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬০ জন কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই বলেন, ‘২৫ জন প্রকৌশলী, চালক ও রান্নাঘরের কর্মী এবং আরও ৩৫ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে কাজ করছিলেন। সকাল থেকে তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’ তিনি জানান, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল; দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল।

তিমুরের রাসুয়া কাস্টমস কার্যালয়ের প্রধান রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানা জানান, তাদের ১৫ জন কর্মী নিখোঁজ।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানান, বন্যায় আটকে পড়া ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাইলুং গ্রামের আরও ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১৩ জনকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের স্থানীয়ভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু আহত ব্যক্তি ত্রিশূলি ক্যাম্পে চিকিৎসাধীন।

উদ্ধার অভিযানে ১২ থেকে ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি নেপাল সেনাবাহিনীর, বাকিগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাসুয়ার উদ্দেশে ২৯টি বেসরকারি ও ৬টি সামরিক হেলিকপ্টার উড়েছে। এর মধ্যে ২৩টি বেসরকারি ও ২টি সামরিক হেলিকপ্টার আহতদের নিয়ে কাঠমান্ডুতে ফিরেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া তিনটি হেলিকপ্টারকে ফিরে আসতে হয়েছে।নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং এবং সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী খড়ক রাজ পাউডেল ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।

কাঠমান্ডু-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপালের অংশে লেন্দে খোলা নদীতে বরফ-পাথরের ধসই এ বিপর্যয়ের কারণ, তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষ জমে আছে। কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা করছে।’

চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ধসটি নেপালের অংশে ঘটলেও তা তিব্বতের জিরং বন্দরে আঘাত হানে। এতে শিগাৎসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, জিরং সীমান্তে অন্তত ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে। এক উদ্ধারকর্মী সিসিটিভিকে জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দলটির কমপক্ষে চার ঘণ্টা লাগবে; কারণ পথে দেড় মিটার গভীর কাদা-পাথর জমে আছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন