
চাকাগুলো যেন আজ স্থবির হয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের বুড়িচং, চান্দিনা ও দাউদকান্দি থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের আষাড়িয়ার চর ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন কেবল সারি সারি গাড়ির দীর্ঘ অপেক্ষা। এই অমানবিক ও অসহ্য যানজটের মাঝে আটকে পড়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এক মুমূর্ষু রোগী।
«একটু দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারলে হয়তো আমার মানুষটাকে বাঁচানো যেত!»—মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের এই বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের বাতাস। শুধু এই একটি মৃত্যুই নয়, দীর্ঘ জ্যামের এই করুণ খাঁচায় বন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবন পার করছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, শিশু ও বয়স্করা।
যেভাবে থমকে গেল স্বাভাবিক জনজীবন
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আষাড়িয়ার চর ব্রিজের ঢাকা অভিমুখী লেনের একটি বড় গর্ত মেরামতের কাজ শুরু হয়। দুই লেনের একটি বন্ধ রেখে বিকল্প এক লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করায় মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র গাড়ির চাপ। রাতের অতিরিক্ত যানবাহনের ধাক্কায় সেই চাপ ছড়িয়ে পড়ে কুমিল্লার চান্দিনা ও দাউদকান্দি পর্যন্ত। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক গতিশীল মহাসড়কটি পরিণত হয় এক দীর্ঘ পার্কিং লটে।
ভোগান্তির নির্মম চিত্র ও মানুষের কান্না
এই আকস্মিক যানজটে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন বিদেশগামী যাত্রী ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। নির্ধারিত সময়ে বিমান ধরতে না পারার শঙ্কায় বুক চাপড়াচ্ছেন প্রবাসীরা। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে এআই ক্যামেরার কড়াকড়ির কারণে চালকরা একটু বিকল্প বা উল্টো পথে গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না।
এই চরম সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু অটোরিকশা ও সিএনজি চালক সাধারণ যাত্রীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছেন। তীব্র গরমে ছোট শিশু ও অসুস্থ রোগীরা গাড়ির ভেতরেই হাঁপিয়ে উঠছেন।
প্রশাসনের তৎপরতা বনাম মানুষের হাহাকার
যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা দাবি করলেও, দীর্ঘ এই স্থবিরতা ভাঙতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থেকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত মানুষগুলোর একটাই প্রশ্ন—জরুরি কাজের এই মহাসড়কগুলোতে কেন এমন আকস্মিক সংস্কারকাজ শুরু করার আগে বিকল্প ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের কথা ভাবা হয় না?
অ্যাম্বুলেন্সের চাকা থমকে যাওয়ার এই বেদনাদায়ক ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমাদের ট্রাফিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় আরও কতটা সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন।




