নাগেশ্বরীতে সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় নতুন করে সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, দলবদল ও বিভিন্ন সময়ে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিতির অভিযোগ সামনে আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এদিকে প্রার্থীদের বিষয়ে পুলিশি বিশেষ শাখা (ডিএসবি) যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, ডিলার নিয়োগের তালিকায় থাকা কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষে আনুষ্ঠানিক দলীয় নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে স্থানীয়দের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণপুর ইউনিয়নের মো. মাইদুল ইসলাম আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত। একই ইউনিয়নের আলহাজ ইয়াকুব আলী জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তাঁর নামে একাধিক ডিলারশিপ থাকার বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। অপর প্রার্থী মো. সোবাহান আলীকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উল্লেখ করে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করছে, ৫ আগস্টের পর তিনি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
রায়গঞ্জ ইউনিয়নে শফিকুল ইসলাম শফীকে সাবেক জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পরবর্তী সময়ে ‘মুজিবনগর ফাইল’–সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন। একই ইউনিয়নের ফারুক হোসেন বাবুর পরিবারের জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।
নাগেশ্বরী পৌর এলাকার আবু তাহেরকে বিগত সরকারের সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে এবং জাকারিয়া বাবলুকে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করেছে। নেওয়াশী ইউনিয়নের আবদুর রহমানের জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একইভাবে কালীগঞ্জ ইউনিয়নের দীপুকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সার সংকটের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ
ডিলার নিয়োগ নিয়ে এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন নাগেশ্বরীর বিভিন্ন এলাকায় সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী ও রামখানা ইউনিয়নে সারের দাবিতে কৃষকেরা গুদামের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরদিন কচাকাটায় চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত কৃষকেরা একটি সারের গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় সার কম পাওয়ায় তাঁদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সার না পেয়ে খালি হাতেও ফিরতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সার বিতরণব্যবস্থায় ডিলারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার নতুন সার ডিলার নিয়োগ দিয়ে জনগণের ভোগান্তি কমানোর যে প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছ,তা নস্যাৎ করার ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা এই বিতর্কিত ব্যক্তিগত ডিলার নিয়োগ পেলে করবে না তার নিশ্চয়তা নেই।তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, প্রার্থীর ব্যবসায়িক সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা, গুদাম ও সরবরাহব্যবস্থা, আইনগত ও প্রশাসনিক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কোনো অনিয়মের তথ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন নজর রয়েছে ডিএসবি যাচাইসহ প্রশাসনিক অনুসন্ধানের ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। নতুন ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে নিয়মিত ও সুষ্ঠুভাবে সার পৌঁছানো এবং বিদ্যমান সংকট কমানোই হবে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন