
বর্ষা এলেই পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের মানপাশা বাজার সংলগ্ন আটঘর খাল পরিণত হয় এক ব্যতিক্রমী ভাসমান নৌকার হাটে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই হাট দক্ষিণাঞ্চলের নদীনির্ভর জনজীবনের এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যেখানে খালের বুকেই চলে কাঠের ডিঙি নৌকার কেনাবেচা।
প্রতি সোমবার ও শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসা এই হাটে পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল, বরগুনা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা আসেন। বর্ষাকালে কৃষিকাজ, মাছ ধরা, পেয়ারা ও আমড়া পরিবহন এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের নৌকার চাহিদা বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, নৌকা নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠী, রাজাপুর, জিন্দাকাঠী, হরিহরকাঠীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কারিগর পরিবার। বংশপরম্পরায় তারা রেইন্ট্রি, কড়ই, গামারি, চাম্বল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাটে সাধারণত ১০ থেকে ২২ ফুট দৈর্ঘ্যের ডিঙি নৌকা বেশি বিক্রি হয়। কাঠ, আকার ও নির্মাণশৈলীর ওপর নির্ভর করে একটি নৌকার দাম কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। অনেক ক্রেতা নৌকা বেয়ে বাড়ি নিয়ে যান, আবার কেউ পিকআপ বা ট্রাকে পরিবহন করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরোজপুরের এই নৌকার হাট কেবল একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের লোকজ নৌ-সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই এলাকায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান পেয়ারার বাজার থাকায় বর্ষা মৌসুমে দেশ-বিদেশের পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে এই হাট।
তবে নৌকা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাঠের দাম বৃদ্ধি, দক্ষ কারিগরের সংকট, অতিরিক্ত খাজনা এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারের কারণে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আগের মতো লাভজনক নেই। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে আটঘর-কুড়িয়ানার শতবর্ষী নৌকার হাট বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও বিকশিত হতে পারে।।





