ভূমিকম্প: ঝুঁকিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল

চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় একশ ভূমিকম্প হয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সর্বোচ্চ সাত মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতা থাকা ফল্ট লাইনগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।

এ অবস্থায় প্রকৌশলীদের এক সেমিনারে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রাজউকের একক নির্ভরতার বাইরে গিয়ে ভবন নির্মাণ তদারকিতে তৃতীয় পক্ষ যুক্ত করার কথাও উঠে এসেছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘ভূমিকম্প: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজক ‘প্রগতিশীল প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি সমাজ’।

সেমিনারের সভাপতি প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, সেখানে ওই ভূমিকম্পে প্রাণহানি ছাড়াও ভবনের ক্ষয়ক্ষতি ক্ষয়ক্ষতি ও মাটিতে ফাটল ধরার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, এসব কারণে জনমনে একটা ভীতির সঞ্চার হয়।

তিনি বলেন, এরপর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় শতাধিক ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে ১৫-২০টি সাধারণ মানুষ অনুভব করতে পেরেছে। যা দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

বাংলাদেশে সিসমোগ্রাফ দিয়ে ভূ-কম্পন জরিপের ক্ষেত্রে অনেক বেশি দুর্বলতা থাকার কথা তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেন, যে কারণে ‘ইউএসজিএস’ এর প্রাপ্ত তথ্যকেও ভিত্তি হিসেবে আলোচনা করতে দেখা যায়। আমাদের জানামতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগে ১৩টি সিসমোগ্রাফ যন্ত্র দিয়ে ২০০৩ সালে একটি প্রজেক্টে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অর্থ বরাদ্দের অভাবে সেগুলো আর ব্যবহার করা হচ্ছে না।

ভূমিকম্পসহ ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরকে দিয়ে, যেখানে পেশাজীবী ও গবেষকদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেনের। তার দাবি, আমলাতান্ত্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রশাসনিক ক্ষমতা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার কারণে এই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভূমিকম্প সম্পর্কে আমাদের বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় বাংলাদেশে নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা করা তাই জরুরি।

ভূমিকম্পের সময়ে মানুষের নিরাপদ অবস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কাজের গুরুত্বের দিকও তুলে ধরেন এই প্রকৌশলী।

উদ্ধার তৎপরতায় নাগরিকদের যুক্ত করতে হলে ক্রেন, বুলডোজার, হ্যামার, ড্রিলসহ পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা, জনবল তৈরি, দুর্যোগকালীন সম্ভাব্য কার্যক্রমের অনুশীলন, ইত্যাদির ব্যবস্থা করার বিষয়েও জোর দেন তিনি।

ভূমিকম্প ও ভবনের নকশা বিষয়ক গবেষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারির মতে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সবচেয়ে জরুরি তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে ভবনের নকশা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউককে দিয়ে নিরীক্ষণ করার মাধ্যমে নিরাপদ ভবন তৈরি করা। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থা থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ভবন নির্মাণে রাজনৈতিক পর্যায়ে সঠিক দিকনির্দেশনা জরুরি। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে বেশি ব্যয় হলেও প্রতিরোধমূলক নির্মাণে যথাযথ বিনিয়োগ দেখা যায় না। ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ভবনের ভেতরে নিরাপদ অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রকৌশলী ও স্থপতিদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভূমিকম্প নিয়ে ঝুঁকি যাই থাকুক, প্রয়োজন সতর্কতা ও করণীয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করা। শুধু আইন করে ঝুঁকি এড়ানোর বদলে জনগণকে সচেতন হতে হবে, যাতে অনিরাপদ ভবন তৈরি না হয়।

চিলিতে ৮ এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে ৭০০ জনের প্রাণহানির সঙ্গে হাইতিতে ৭ মাত্রায় দুই লাখ মানুষের প্রাণহানির তুলনা করে বিজ্ঞানসম্মত ধারণা নিয়ে নিরাপদ ভবন নির্মাণকেই সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

বুয়েটের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউটের সাবেক সভাপতি খন্দকার সাব্বির আহমেদ বলেন, অনিরাপদ ভবনকে নিরাপদ করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। যাদের সামর্থ্য নেই, সেই সব ভবনের ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর ফান্ড) তহবিল নিয়ে এটা করা সম্ভব।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ রহমান বলেন, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের কোস্টাল বেল্টে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, কোস্টাল বেল্টকে অনিরাপদ করছে। প্রাণ প্রকৃতি ও মানবিক বিপর্যয় ঘটানোর হাত থেকে রক্ষার দাবি জানান তিনি।

উল্লেখ্য, সেমিনারের শুরুতে রানা প্লাজা ধ্বসের হতাহতের ঘটনা স্মরণ করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সেমিনার সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রূমন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন