
একসময় যে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ছিল মানুষের মুখে মুখে, হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর পদচারণায় যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল কর্মচঞ্চল—সেই কেয়া গ্রুপ এখন যেন হারিয়ে যেতে বসেছে অনিশ্চিত অন্ধকারে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র পর্দায় নিয়মিত দেখা যেত কেয়া কসমেটিকসের নজরকাড়া বিজ্ঞাপন। নোবেল ও মৌ-এর বিজ্ঞাপনও তখন দর্শকদের ব্যাপক আকর্ষণ করেছিল।
সেই পরিচিত কেয়া গ্রুপ আজ কঠিন সময় পার করছে।
ব্যাংকিং জটিলতা, কাঁচামালের সংকট এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে লে-অফে রয়েছে বলে জানা গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক-কর্মচারী।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা আর দীর্ঘদিনের বেতন-ভাতা না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অনেক কর্মীর। সংসার চালাতে কেউ কেউ ঘুরছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও মিলছে না অনেকের।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিশেষভাবে সক্ষম কর্মীরা। তাদের মধ্যে কয়েকশ কর্মী রয়েছেন, যারা শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দীর্ঘদিন কেয়া গ্রুপে কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসময় কেয়া গ্রুপের কারখানা এলাকায় ছিল হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্য। মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকের সামনে দেখা যেত মানুষের ভিড়। চাকরির আশায় অনেকে অপেক্ষা করতেন।
অথচ সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
কারখানার প্রধান ফটকের সামনে নেই আগের সেই কোলাহল। আশপাশের দোকানপাটেও নেমে এসেছে ব্যবসায়িক মন্দা। যে এলাকায় একসময় হাজারো মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তাদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। কেউ ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে অন্য কাজের সন্ধানে ছুটছেন।
তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ বলছে, কেয়া গ্রুপ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংকট কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আবারও উৎপাদনে ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু শ্রমিকদের প্রশ্ন—কবে কাটবে এই সংকট? কবে তারা ফিরে পাবেন তাদের কর্মসংস্থান ও বকেয়া পাওনা?
একসময় টেলিভিশনের পর্দায় যার বিজ্ঞাপন ছিল মানুষের প্রিয়, যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হাজারো পরিবারের জীবিকা—সেই কেয়া গ্রুপের বর্তমান চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কর্মচঞ্চল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জায়গায় এখন নেমে এসেছে নীরবতা। আর সেই নীরবতার মধ্যেই শোনা যাচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা।
হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর একটাই প্রত্যাশা—আবারও ঘুরে দাঁড়াবে কেয়া গ্রুপ। ফিরে আসবে সেই কর্মচাঞ্চল্য, ফিরে আসবে পুরোনো সেই সুদিন।
কিন্তু তার আগে প্রয়োজন সংকটের দ্রুত সমাধান এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা।
একসময়ের স্বনামধন্য কেয়া গ্রুপ কি আবারও ফিরে পাবে তার সেই সোনালি দিন—নাকি অনিশ্চয়তার অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানটি? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে শ্রমিক-কর্মচারী ও স্থানীয় মানুষেমানুষের ।





