ঢাকার চাপে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত, দুই দেশের সম্পর্ক সন্ধিক্ষণে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা যখন চাপ বাড়াচ্ছে তখন বাংলাদেশের বিষয়ে অবস্থান বদলাচ্ছে ভারত। এক্ষেত্রে তারা পারস্পারিক স্বার্থের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা বোঝাতে প্রথমবারের মতো ভারত ইংরেজিতে ‘রেসিপ্রোসিটি’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। যার অর্থ পারস্পরিক স্বার্থ, আদানপ্রদান। এমন খবর প্রকাশ করেছে ভারতের অনলাইন দ্য প্রিন্ট। কেশব পদ্মনাভনের লেখা ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন- বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার (রেসিপ্রোসিটি) ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক চায় ভারত। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সংবাদ সম্মেলন নিয়ে আমাদের অবস্থান নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। প্রত্যর্পণের বিষয়ে আমাদের ধারাবাহিক অবস্থান হলো- এ ধরনের অনুরোধ আমাদের প্রচলিত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

তার ব্যবহৃত এই ভাষা ঢাকার সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত এই প্রথমবার ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা ‘পারস্পরিকতা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। এমন সময়ে ভারত এই শব্দ ব্যবহার করছে, যখন বাংলাদেশ নিজেই জোর দিয়ে বলছে যে- দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে ‘সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার’ ভিত্তিতে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন একটি উত্তেজনাপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

দ্য প্রিন্ট মঙ্গলবার জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অদূর ভবিষ্যতে ভারত সফরের কোনো পরিকল্পনা নেই। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনেও তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন, যদিও ভারত তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দ্য প্রিন্ট জানতে পেরেছে, বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে ভারতের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ রাজনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে- তারেক রহমান ভারত সফরে যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ঢাকায় আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ভারত ধারাবাহিকভাবে বলে এসেছে যে তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘আরও শক্তিশালী’ করতে আগ্রহী। কিন্তু মঙ্গলবার ভারতের বক্তব্যে যে অতিরিক্ত ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে- বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বক্তব্যের পর ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণই নয়, রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত খুনিদেরও প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। এসব দাবির ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

কূটনৈতিক জায়গা সংকুচিত হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে আরও কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ খুব বেশি থাকছে না। কারণ বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলোকে সরাসরি যুক্ত করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোববার ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নতুন অবস্থান প্রকাশ করেছে, তার পর দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি এখন মূলত রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে সংবাদ সম্মেলনের পর গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। হাসিনা আগস্ট ২০২৪ সালে ঢাকা ছেড়ে নয়াদিল্লিতে যান এবং তখন থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন। ভারত অবশ্য হাসিনার সংবাদ সম্মেলন থেকে দ্রুত নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়। চলতি মাসের শুরুতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, এটি হাসিনার ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান। কিন্তু এতে ঢাকার ক্ষোভ কমেনি; বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।

গত নয় মাসে ভারত একাধিক উচ্চপর্যায়ের সফর ও বৈঠকের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার আগ্রহ দেখানোর চেষ্টা করেছে। গত বছরের শেষ দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রশংসিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক হয়।

বৈঠকের পর ভারতের বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। গত মাসে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম (অব.) নয়াদিল্লিতে বিমসটেক-এর জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠকে অংশ নেন। গত সপ্তাহে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় এসে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন।

এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য কী ছিল?

এসব উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। ভারত এ বছরের শুরুতেই তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পাশাপাশি আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে- বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার ভূমিকাকে বিবেচনা করে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

সিরাজগঞ্জ বাগবাটিতে ভটভটি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে চালক নিহত-উত্তেজিত জনতা ভটভটি আটক, ইউপি সদস্যের মোটরসাইকেল ভাংচুর

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদের সংলগ্ন পাকা রাস্তায় ভটভটি