
পিরোজপুরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সরকারি হাসপাতালের হিসাবেই চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ২৭০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৮ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ২২৫ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
পিরোজপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২৪ অক্টোবরের দৈনিক ডেঙ্গু রোগের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য একত্র করা না হলে জেলার সংক্রমণের সামগ্রিক চিত্র নিরূপণ কঠিন।
২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ৬৮ জন
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ২১ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন, নেছারাবাদে ৯ জন, কাউখালীতে ১১ জন, ভান্ডারিয়ায় ২০ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ সময়ে নতুন রোগী ভর্তির তথ্য নেই। সব মিলিয়ে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৮।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা হাসপাতালে ১ হাজার ৭৭৯ জন, নাজিরপুরে ৩৯৩ জন, নেছারাবাদে ৬৯৫ জন, কাউখালীতে ২৮৩ জন, ভান্ডারিয়ায় ৮০৩ জন, মঠবাড়িয়ায় ২০৫ জন এবং জিয়ানগরে ১১২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ২৭০।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৪ জন। ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা একজন; গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন মৃত্যুর তথ্য নেই।
সরকারি হিসাবের বাইরে কত রোগী?
সরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যানে জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেলেও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য রোগীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। জ্বর, দুর্বলতা ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাচ্ছেন। কেউ বেসরকারি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা, বরিশাল ও ঢাকামুখী হচ্ছেন।
তবে বেসরকারি পর্যায়ে কতজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, কতজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন কিংবা কতজন অন্য জেলায় চিকিৎসা নিচ্ছেন—তার সমন্বিত ও যাচাই করা পরিসংখ্যান পাওয়া না যাওয়ায় সরকারি হিসাবের বাইরে রোগীর প্রকৃত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
চিকিৎসাসেবায় বাড়তি চাপের আশঙ্কা
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রোগীর তথ্য সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠানো জরুরি।
বিশেষ করে কোন উপজেলায় রোগীর সংখ্যা বেশি, কোথায় হাসপাতালে ভর্তির চাপ বাড়ছে এবং কোথায় চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। জেলার বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের তথ্যও যথাসম্ভব সংগ্রহ করা গেলে সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা গণনা করলেই হবে না; সংক্রমণের বিস্তার রোধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও জোরদার করতে হবে। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত চিত্র নিরূপণ, রোগীর চাপ অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা পরিকল্পনা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
পিরোজপুরে সরকারি হিসাবেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ২৭০-এ পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৮ জনের ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করাই গুরুত্বপূর্ণ।





