রংপুর অঞ্চলের রক্তিম অতীত, বিষণ্ণ বর্তমান ও মুক্তির রূপরেখা

অবিভক্ত বাংলা তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক চেতনার ইতিহাসে উত্তর জনপদের প্রাণকেন্দ্র রংপুর এক অবিস্মরণীয় সংগ্রামের নাম। ঔপনিবেশিক শোষণ, অন্যায় ও অন্যায্য রাজস্ব আদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের মানুষ বারবার নিজেদের বীরত্ব, আত্মত্যাগের স্বাক্ষর রেখেছে। ১৭৮৩ সালের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ রংপুর ধিং বা রংপুর কৃষক বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের মনোনীত নিষ্ঠুর রাজস্ব আদায়কারী রাজা দেবী সিংহের অবর্ণনীয় শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কঠোর রাজস্ব দাবির মুখে যখন কৃষকদের গবাদিপশু, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল, তখন রংপুরের বিদ্রোহীরা স্থানীয় কালেক্টর রিচার্ড গুডল্যান্ডকে এক ঐতিহাসিক আবেদনের মাধ্যমে জানিয়েছিল, আপনি এক দেশের প্রধান হতে পারেন, কিন্তু আমাদের যাওয়ার জন্য হাজারটি দেশ রয়েছে। তারা সেদিন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, শাসক যদি প্রজাদের ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হন, তবে সেই শাসন মেনে নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা প্রজার থাকে না। কৃষক চেতনার এই অদম্য স্বাধিকারবোধ, শাসকের সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা তৎকালীন পুরো বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

চল্লিশের দশকের প্রাক্কালে মেহনতি কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনেও রংপুর বিভাগের ডিমলা, কিশোরগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। জমিদারের শোষণ, পুলিশের লাঠি-গুলির সামনে দাঁড়িয়ে হিন্দু, মুসলিম, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের আদিবাসী কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে “জান দেব তবু ধান দেব না” স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ননী ভৌমিকের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকদের লেখনীতেও উঠে এসেছিল রংপুরের এই অকুতোভয় কৃষক-বধূ ও সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষার আখ্যান। তৎকালীন প্রথাগত গ্রামীণ কাঠামোর বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতার প্রাচীর ভেঙে কৃষক সমিতি, বামপন্থী চেতনার অধীনে এই অঞ্চলের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষ যেভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হয়েছিল, তা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন সামাজিক দিগন্তের সূচনা করেছিল।

জাতীয় মুক্তির সংগ্রামেও রংপুর অঞ্চল সর্বদা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের একমাত্র সম্পূর্ণ মুক্তাঞ্চল ভিত্তিক যুদ্ধক্ষেত্র সেক্টর-৬ গঠিত হয়েছিল সমগ্র রংপুর জেলা, দিনাজপুর জেলার একাংশ নিয়ে। লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে এই সেক্টরের সদর দফতর স্থাপন করে বীর মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আর সাম্প্রতিক ইতিহাসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রাজপথ যখন স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু, গুলিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখন ১৬ জুলাই ২০২৪-এ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক পেতে পুলিশের গুলির সামনে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্য সমগ্র বাংলাদেশের সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করেছিল। আবু সাঈদের এই মহীয়ান আত্মত্যাগই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদের পতনের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে এক অভূতপূর্ব জাতীয় গণবিপ্লবে রূপ দিয়েছিল।

তবে এই গৌরবোজ্জ্বল, বৈপ্লবিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিপরীতে যখন রংপুরের বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তখন এক চরম বৈপরীত্য ও করুণ বঞ্চনার চিত্র উন্মোচিত হয়। যে অঞ্চল শতবর্ষ ধরে জাতীয় বিপ্লব, স্বাধিকার আন্দোলন-সংগ্রামে জীবন বিলিয়ে প্রথম সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই রংপুর আজ জাতীয় উন্নয়ন মানচিত্রে অবহেলিত। অথচ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অন্যান্য বিভাগ ও অঞ্চল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে গেলেও উত্তরবঙ্গের এই বিশাল ভূমি জাতীয় রাজস্ব, শিল্প বিনিয়োগ, প্রশাসনিক মনোযোগের তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ইতিহাস গড়ে দেশকে রাজনৈতিক পথ দেখানো একটি জনপদ কেন আজ অর্থনৈতিক স্থবিরতা, শিল্পায়নহীনতা এবং দারিদ্র্যের অভিশাপের বৃত্তে বন্দী থাকবে? এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও উন্নয়ন বিশ্লেষকের মনে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে রংপুর বিভাগ জাতীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। রাজধানী ঢাকা ও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম থেকে ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি হওয়ায় এ অঞ্চলে কাঁচামাল পরিবহন, উৎপাদিত পণ্য জাতীয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যমুনা নদীর কারণে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে যে ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা ছিল, তা যমুনা সেতু এবং পরবর্তীতে হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্পের মাধ্যমে কিছুটা কমেছে। তবে পরিবহন ব্যয়, অতিরিক্ত সময়ের মতো প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি দূর হয়নি। স্থলবেষ্টিত এই সীমান্ত জনপদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম, ঢাকা অঞ্চলের মতো স্বাভাবিক ভৌগোলিক সুবিধা পায়নি।

কিন্তু ভৌগোলিক এই দূরত্বকে নেতিবাচক দিক হিসেবে না দেখে রংপুরের অসীম কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এই অঞ্চল পুরো দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। রংপুর বিভাগ মূলত একটি কৃষিভিত্তিক উদ্বৃত্ত অঞ্চল, যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই অঞ্চলের আটটি জেলায় ধান, আলু, পাট, ভুট্টা, গম, সরিষা, শাকসবজি, পেঁয়াজসহ বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলের আলুর বাম্পার ফলন ও তামাক চাষ থেকে সরে এসে মসলা, ভুট্টা, নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজি চাষে কৃষকদের ঝুঁকে পড়া উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

এই কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে প্রথাগত কৃষি থেকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, বাণিজ্যিক কৃষিতে উত্তরণ ঘটানো অপরিহার্য। রংপুরে উৎপাদিত পচনশীল কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, মাল্টি-কম্পার্টমেন্ট সেন্ট্রাল প্যাক হাউস এবং কুল-চেইন লজিস্টিকস অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পচনশীল ফল, সবজির ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ অপচয় রোধ করা গেলে বছরে শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন করে আলু, ভুট্টা থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পোল্ট্রি ফিড ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট তৈরি করলে ব্যাপক মূল্যসংযোজন ঘটবে। পাশাপাশি ভারত, নেপাল, ভুটানের সীমান্তসংলগ্ন বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে রংপুর বিভাগের কৃষি অর্থনীতি জাতীয় জিডিপিতে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

রংপুর বিভাগের আর্থ-সামাজিক পিছিয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর চ্যালেঞ্জ কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সমীক্ষা অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৪.৮ শতাংশ। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটের মতো বেশ কিছু প্রান্তিক উপজেলায় চরম দারিদ্র্য বা খাদ্য দারিদ্র্যের হার ৪৭.৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রাক-আমন মৌসুমে এই অঞ্চলে কাজ, আয়ের চরম সংকট দেখা দিত, যাকে স্থানীয় ভাষায় “মোঙ্গা” বলা হতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষির বৈচিত্র্যকরণের ফলে চরম মোঙ্গার তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবে স্থায়ী ও গঠনগত দারিদ্র্য এখনও দূর হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের খুলনা, বরিশাল, সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবারগুলো যেখানে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটাচ্ছে, সেখানে রংপুরে রেমিট্যান্স প্রবাহ একেবারেই তলানিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জেলাভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আসা মোট বৈদেশিক রেমিট্যান্সের মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি আসে সমগ্র রংপুর বিভাগে। শিল্পায়নের অভাবের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের এই তীব্র খরা রংপুরকে চরম মূলধন সংকটে ফেলেছে। এর প্রধান কারণ রংপুর অঞ্চল থেকে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এ বিষয়ে কাঠামোগত উদ্যোগের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট উত্তরণে রংপুরে একটি রিজিওনাল স্কিলস হাব গঠন করে জাপানি, কোরিয়ান ও আরবি ভাষা শেখানোর পাশাপাশি কেয়ারগিভিং, ড্রাইভিং, ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, আইটি বিষয়ে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

কোনো অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার হলো শিল্পায়ন। কিন্তু রংপুর বিভাগ দীর্ঘকাল ধরে চরম শিল্পায়নহীনতার শিকার। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ৯১.৮ শতাংশ স্থানীয় অধিবাসী ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, রংপুরের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার প্রধান কারণ শিল্পকারখানার অনুপস্থিতি। এর অন্যতম প্রধান কারণ পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের মারাত্মক সংকট এবং শিল্পবান্ধব অবকাঠামোর অনুপস্থিতি। পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় ভারী শিল্প, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনে স্থানীয়, জাতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে এসব উদ্যোগ অলাভজনক হয়ে ওঠে। উপরন্তু, রংপুরের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় শিল্পস্থান নির্ধারণে জটিলতা, গাইবান্ধায় প্রস্তাবিত রংপুর ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতের চড়া সুদহার, পুঁজি সংকটসহ উদ্যোক্তা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে আছে।

অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য মানবসম্পদের উন্নয়ন অপরিহার্য। কিন্তু পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার রংপুর বিভাগে উচ্চশিক্ষার জন্য ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ থাকলেও নেই পর্যাপ্ত বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উচ্চশিক্ষার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি দক্ষতারও মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরের শ্রমশক্তির মাত্র ৫.৮ শতাংশ কারিগরি বা পেশাগত প্রশিক্ষণ পেয়েছে। অথচ এই অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার ৩০ শতাংশ তরুণ প্রশিক্ষণ নিতে চরম আগ্রহী। যোগ্য, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হওয়ায় স্থানীয় তরুণরা শ্রমবাজারে ভালো মানের উচ্চমজুরির কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামোর দুর্বলতা রংপুর বিভাগের বাণিজ্যিক বিকাশকে দীর্ঘদিন ধরে থমকে দিয়েছে। যদিও যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে, তবে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে রংপুর এখনও অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা হলে ভারত, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের পচনশীল কৃষিপণ্য কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর একটি অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জেলাগুলো। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী জেলা প্রতি বছর তীব্র নদীভাঙন, আগাম বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার মুখোমুখি হয়। নদীভাঙনে হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা, ফসলি জমি হারিয়ে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে। এই চিরস্থায়ী দুর্যোগ মোকাবিলায় নদী খনন, টেকসই ও আধুনিক বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দাবি, বহুল আলোচিত তিস্তা মাস্টার প্ল্যান বা তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কৃষি, সেচ ব্যবস্থা, সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এখানে অত্যন্ত সীমিত। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৭০.৫ শতাংশ মানুষ আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাব এবং ৬৭.২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবার অপর্যাপ্ততাকে প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া দরিদ্র এবং দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় ভিডব্লিউবি, ভিজিএফ, খোলা বাজারে খাদ্য বিক্রি, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

জাতীয় বাজেটে রংপুর বিভাগের প্রতি ঐতিহাসিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক অবহেলা স্পষ্ট। দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বরাদ্দের দিকে তাকালেই এই বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে। যেখানে ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন যথাক্রমে ৬,৭৫১ কোটি, ৫,২৬৯ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১,৮৮৭ কোটি টাকা বাজেট পায়, সেখানে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২০ কোটি টাকার মতো নামমাত্র অঙ্ক। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এই বৈষম্যমূলক আচরণের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, জাতীয় সংসদে রংপুরের ন্যায্য পাওনা আদায়ে জোরালো ভূমিকা না রাখার প্রবণতা এই অবহেলাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।

রংপুরের সার্বিক পিছিয়ে পড়ার আরেকটি বড় অভ্যন্তরীণ কারণ হলো স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐক্য, সামাজিক দরকষাকষির সক্ষমতার অভাব। দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে দলীয় রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক অন্তর্দ্বন্দ্ব কিংবা নেতৃত্বের অনৈক্য বারবার রংপুরের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প আদায়ের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছে। সিলেট অথবা চট্টগ্রামের মতো রংপুরের মানুষ নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে জাতীয় নীতি নির্ধারকদের কাছে দৃঢ়ভাবে দরকষাকষি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ অনৈক্য উন্নয়নবঞ্চনা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

উত্তর জনপদের এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটিয়ে আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি, জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রংপুরকে সম্পৃক্ত করতে হলে বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভর না করে রংপুর বিভাগের তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় কৃষিপণ্য ভিত্তিক ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প স্থাপনে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি তরুণদের জন্য বিশেষ এগ্রোপ্রেনিওরশিপ স্টার্টআপ নীতি, কৃষি সমবায় নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেটে উত্তরবঙ্গের জন্য ঘোষিত কৃষি হাব উন্নয়ন প্যাকেজের আওতায় ৩,০০০ কোটি টাকার উদ্দীপনা তহবিল কার্যকর করা, গাইবান্ধায় রংপুর ইপিজেডের কাজ দ্রুত দৃশ্যমান করা, দুটিই এখন সময়ের দাবি।

জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যাকে মানদণ্ড হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনকে প্রধান বিবেচনায় নিতে হবে। রংপুর অঞ্চলকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে সৈয়দপুর বিমানবন্দর, বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী স্থলবন্দর, পাশাপাশি মংলা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি রংপুর অঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), টেক্সটাইল, সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসার ঘটাতে পারলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির গতি বহুগুণ বাড়ার পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের জাতীয় লক্ষ্যে রংপুর একটি শক্তিশালী অংশীদারে পরিণত হতে পারে।

রংপুর কোনো করুণার পাত্র নয়; রংপুর তার রক্তে কেনা ইতিহাস, ন্যায্য অধিকারের দাবিদার। ১৭৮৩ সালের রংপুর ধিংয়ের সংগ্রামী কৃষক থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ২০২৪-এর শহীদ আবু সাঈদের মহীয়ান আত্মত্যাগ বারবার প্রমাণ করেছে, অবহেলা, বৈষম্য রংপুরের মানুষের বীরত্বকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আজ সময় এসেছে রাজপথের সেই সাহসী সংগ্রামকে অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসংগ্রামে রূপান্তর করার। ইতিহাসের গৌরবকে শক্তিতে পরিণত করে রংপুরের ন্যায্য অধিকার, উন্নয়ন, সমৃদ্ধির জন্য নতুন লড়াই গড়ে তুলতে হবে।

উত্তর জনপদের অবহেলা ও অনগ্রসরতার তিলক মুছে ফেলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আঞ্চলিক সামাজিক ঐক্য, রাজনৈতিক সচেতনতা। দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত সব ক্ষুদ্র বিভাজন ভুলে রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী, তরুণ প্রজন্মকে একই সূত্রে গাঁথতে হবে। কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদেরও বুঝতে হবে, দেশের একটি বিশাল অঞ্চল পৌনে দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্য, অনুন্নয়নের অন্ধকারে রেখে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, আধুনিক কৃষি ও শিল্পের প্রসার, আন্তর্জাতিক বিমানে যোগাযোগ স্থাপন, দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে রংপুরকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে রংপুর ফিরে পাক তার আত্মমর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন